শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার চেয়ে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ২৩:০৮

কুমিল্লা, রংপুর, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পূজামণ্ডপে সাম্প্রদায়িক হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন হলের শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমের ভক্তরা। এ সময় সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিতের দাবিসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরে প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আর কোথাও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা-ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে আন্দোলনকারীরাই তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নেবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

টানা পৌনে চার ঘণ্টা সড়ক অবরোধের কারণে শাহবাগ মোড় দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে রাজধানীর পল্টন, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বাংলা মোটর, ফার্মগেট ও টিএসসিমুখী সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। অনেকে হেঁটে ও ঘোরাপথে রিকশায় গন্তব্যে পৌঁছান। দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ মোড় ত্যাগ করলে ধীরে ধীরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাবির জগন্নাথ হলসহ অন্যান্য হলের শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে রাস্তায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে ঢাবির শিক্ষকরাও যোগ দেন। আন্দোলনকে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন ঢাবির জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ মিহির লাল সাহা, সাবেক প্রাধ্যক্ষ অসীম কুমার সরকার ও আইন বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেয় ইসকন বাংলাদেশ। কর্মসূচির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘সংখ্যালঘুর       নিরাপত্তা, দিতে হবে দিতে হবে’, ‘৪৬-এর চেতনায়, বাংলাদেশ চলবে না’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, জঙ্গিবাদের ঠাঁই নাই’, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘আমার ভাইয়ের খুনি কে, ফাঁসি দাও দিতে হবে’, ‘জঙ্গিবাদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি স্লোগান দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান সবাই।

আন্দোলনের সমন্বয়ক জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দেব দত্ত জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের দাবি মেনে না নেন তাহলে আবার আন্দোলনে যাব। আর এর মধ্যে যদি আবার কোনো মন্দিরে হামলা চালানো হয় তা হলে আমরা তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নেব। জয়দেব দত্ত আরো বলেন, আশা করেছিলাম আমাদের সাত দফা দাবির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কোনো একটা আশ্বাস আসবে। কিন্তু সে রকম কোনো আশ্বাস আমরা পাইনি। ইসকন বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে এবং তাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন।

এ সময় তিনি সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার মন্দিরগুলোর সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাটের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, জাতীয় সংসদে আইন করে মন্দির ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠন করতে হবে,  হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের আধুনিকায়ন করে ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে এবং জাতীয় বাজেটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে।

অবরোধে যোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিহির লাল শাহ বলেন, আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ। সবার শরীরে একই রক্ত প্রবাহিত হয়। তাহলে এ ধর্মীয় উন্মাদনা কেন? সরকারের প্রতি আমাদের দাবি, এই সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ করতে হবে। দ্রুত হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আন্দোলনে হাজির হয়ে গাজীপুর জেলার হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক রঘুনাথ বলেন, এ পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অনেক হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোনো ঘটনার বিচার হয়নি। আগে যদি বিচার হতো তা হলে নতুন করে এসব ঘটনা ঘটত না। তবে যত হামলাই হোক না কেন, আমরা বাংলাদেশ ছাড়ব না। এ দেশেই থাকব। তবে সরকারকে সাম্প্রতিক সব হামলার বিচার করতে হবে।

উল্লেখ্য, বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উত্সব দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের নানুয়াদীঘির উত্তর পাড়ের একটি মন্দিরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ তুলে সেই মন্দিরসহ নগরীর কয়েকটি মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এরপর চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনীসহ কয়েকটি জেলায় মন্দিরে হামলা হয়। এ সময় বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে লোকজনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ছয় জন। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গত রবিবার রাতে রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়া জেলেপল্লিতে এক তরুণের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দুদের ৩০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন-বিক্ষোভ সমাবেশ

এদিকে কুমিল্লা, চাঁদপুর, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুরের প্রতিবাদে ও দোষীদের বিচারের দাবিতে গতকাল কুমিল্লা, বরিশাল, মুন্সীগঞ্জ, নীলফামারী, নরসিংদী, বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। একই কর্মসূচি পালিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। কুমিল্লা শহরে এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ।