‘লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার’

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ২২:০৪

ধর্মরক্ষা এবং ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে, বিশ্বের নানা প্রান্তে গণহত্যা আর ভয়াবহ বর্বরতা বাড়ছে যেভাবে; যেভাবে বিশেষ করে, এশিয়া আর আফ্রিকার একাধিক দেশে মানুষের বিরুদ্ধে, সভ্যতা আর শান্তির বিরুদ্ধে বীভত্স অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছে, তাতে সংক্রামক ব্যাধির মতো সর্বত্রগামী হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারে নৈরাজ্য। এক্ষুনি সমস্যাটি নিয়ে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের হাতে, সরকারের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। বিশ্বজনমতকেও জাতিবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, আগ্রাসি মৌলবাদ এবং এসবের সহযোগী সন্ত্রাসবাদের ঘরে-ঘরে, পাড়ায়-পাড়ায়, নিশ্ছিদ্র প্রতিরোধ ও পাহারা জাগিয়ে রাখতে হবে।

যখন কোথাও অঘটন ঘটে, তখনই আমরা আতঙ্ক আর উদ্বেগে প্রতিবাদ গড়ে তুলি, মিছিল করি, হাতে হাত রেখে মানববন্ধনে মিলিত হই। আমাদের হঠাত্ তত্পরতা দেখে মুখোশ-পরা, কিংবা আড়ালের মানুষরূপী দৈত্যরা মিটমিট করে হাসতে থাকে। বলতে বা ভাবতে থাকে যে, তাদের বিরুদ্ধে শক্তির প্রতিস্পর্ধা ক্ষণস্থায়ী। সাময়িক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এসব অপশক্তির এই ধরনের নিভৃত হাসিঠাট্টা কি ভিতহীন, কষ্টকল্পিত? সমস্যাটি যে গুরুতর এবং মানুষের ভবিষ্যেক ঘোর অন্ধকারে, দুর্ভেদ্য পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, তা কি অস্বীকার করে এড়িয়ে যাওয়া যুক্তিসম্মত? সংকটে হঠাত্ সরব হয়ে ওঠা এবং আপাতদৃষ্টিতে সংকটমুক্তি ঘটলেই অলস উদাসীনতা আমাদের পেয়ে বসে। এরকম আবহে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের কুচক্রীরা বসে থাকে না। নরহত্যা, অপকর্ম ও উসকানির নব নব কৌশল তৈরি করে আমাদেরই স্তিমিত প্রত্যাঘাতের আড়ালে এবং সুযোগ পেলেই লোকালয়ে অথবা ধর্মস্থানে তাদেরই নির্বাচিত এজেন্ট পাঠিয়ে প্রথমে আঘাত হানে। পরে গুজব ছড়িয়ে জাগিয়ে তোলে অবদমিত হিংসাকে। এসব হিংসা যেখানেই ঘটুক না কেন, রাজনীতিহীন মানুষকে এক হয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবিরোধের অভ্যাস গড়তে হবে নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডে। এরকম ভাবনার কারণ, বেরাজনীতি আর বেআবরু সাম্প্রদায়িকতা চুপ করে বসে থাকে না। রাতদিন তারা কুমতলবে মশগুল হয়ে আঘাতের নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে থাকে।

সাম্প্রতিক আফগানিস্তানের কথা ভাবুন। তালেবান ক্ষমতায় এলো। কাঙ্ক্ষিত আমিরশাহি গঠন করল। আবার তাদেরই মার্কিনবিরোধী সহযোগীরা প্রথমে কুন্দুজ, পরে কান্দাহারের মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে খুন করল উপাসনারত বহু মানুষকে। দুনিয়া অবাক হয়ে শুনল হত্যাকাণ্ডের দায় বুক ফুলিয়ে স্বীকার করল ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আইএস-কে। এরা কারা? সিরিয়া-ইরাকের তথাকথিত ধর্মীয় রাষ্ট্রের প্রবক্তাদের শাখা-প্রশাখা? তালেবানশাসিত আফগানিস্তানকে এরা বেছে নিল কেন? নিরাপদ আশ্রয় বলে? না তালেবানদের দুর্বলতা আঁচ করে?

তালেবান এদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই ঘোষণা করবে না। ভয়, এদের গণভিত্তি আছে। আইএস-আলকায়েদার জোটে ঘা পড়লে আফগান আমিরিয়তের ভিত কেঁপে উঠবে? অতএব, বহির্দেশীয় আর তাদের অন্তর্দেশীয় সশস্ত্রদের প্রবল রক্তচক্ষু প্রদর্শন না করেই লোক দেখানো যুদ্ধের মহড়া দেখাতে হবে। তালেবানশাসিত আমিরশাহির দুর্বলতাই আইএসকে অথবা সহধর্মী সন্ত্রাসবাদীদের অস্ত্র। আফগান মুলুকের ঘাঁটি থেকেই পাকিস্তান হয়ে এরা সীমান্তবর্তী কাশ্মীরেও প্রবেশ করছে। জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, ভূস্বর্গে যারা পণ্ডিত ও অন্যান্যাদের হত্যা করছে, তারা কাশ্মীরি নয়। বহিরাগত। কাশ্মীরিদের বদনাম রটানোর জন্যই এরা অপকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে। কাশ্মীরি আর অকাশ্মীরি হত্যার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ছড়িয়ে আছে। ফারুক যা বলতে চেয়েছেন, তা পরিষ্কার। অর্থাত্ উসকানির এজেন্টদের লেলিয়া দেওয়া হচ্ছে। ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত।

শারদীয় মরসুমে বাংলাদেশে যেসব অপকাণ্ড ঘটেছে, তা একই ধরনের ছকনির্ভর। এ ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত। পুজোর অপেক্ষায় ছিল সাম্প্রদায়িকতা আর মৌলবাদের এজেন্টরা। উত্সবের মুহূর্তে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে, শান্তির আবহকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এদের লক্ষ্য। লক্ষ্যটি পূর্ণ হয়নি। হওয়া সম্ভব নয়। এ এক অন্যরকম দেশ। তার ভাবাবেগে, তার চেতনায়, তার অঙ্গীকারে জাতির সত্তা আর অসাম্প্রদায়িকতা পুরোপুরি সমার্থক। দেশভাগের প্রায় সঙ্গে ভাষাকেন্দ্রিক আধিপত্যবাদে, সাম্প্রদায়িক উসকানি আর মৌলবাদের মোকাবিলায় যে লড়াই সে শুরু করেছিল, নানাস্তরে আজও অক্ষত তা। এ লড়াইকে থামিয়ে দিতে, ভড়কে দিতে দেশি-বিদেশি শত্রুরাও বসে নেই। সাম্প্রতিকের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা আর এসব অপধর্মকে কবরস্থ করতে বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের সরকার, বাংলাদেশের অসংখ্য গণমঞ্চ ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্য শুধু স্লোগানেনির্ভর নয়, দেশ আর তার ঐতিহ্য রক্ষার মহান লড়াইয়েরই অঙ্গ। সাম্প্রতিক ঘটনার পর শেখ হাসিনা যে কঠোর মনোভাব অবলম্বন করেছেন, তা এক বিরল দৃষ্টান্ত। কাগজে পড়লাম, ১০ হাজার দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ আটক করেছে অন্তত ৫০০ জনকে। ঘটনা যে সাজানো এবং বিবস্ত্র উসকানির অংশ, তা নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন হাসিনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাস রোখার যে-অনুশীলন দেখা যাচ্ছে, তা থেকে প্রতিবেশী দেশগুলি শিক্ষা নিতে পারে না?

সাম্প্রতিক অপকাণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এ কথা বলেছেন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সংযত ও হুঁশিয়ার। তার সংযমে শান্তিরক্ষার সতর্কতাই এই মুহূর্তে প্রবল হয়ে উঠেছে? তা কীভাবে? এক. প্রতিবেশী দেশের ঘরোয়া বিষয় নিয়ে একটিও মন্তব্য করেননি। দুই, পশ্চিমবঙ্গের উসকাানি ও রটনাকে রুখতে তিনি বদ্ধপরিকর। মমতা আর তার দলের সতর্কিত সংযমকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তা কি দিতে পারছি? ডিফেন্স মেকানিজমের ফাঁদে পা দিয়ে কেউ কেউ উপদেশ বণ্টন করেছেন। বিবৃতি জাহির করে উঁচু করছেন আত্মপরিচিতির মহিমা। আবার কিছু সংগঠন, প্রতিবাদের নামে রাজনীতির জমিন অর্জন করতে মরিয়া। এরা ভুলে যাচ্ছেন, এক দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আরেক দেশের নাক গলানো অসংগত। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি যেহেতু সংক্রমক ও বিষাক্ত, সে কারণে বিবৃতির ভাষা ও ইচ্ছায় অতি আবেগকে প্রশ্রয় দিতে নেই। তৃতীয়ত, কী ঘটছে কারা কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক অপকাণ্ডটি করেছে; তারা কারা, কোন সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তায়নের এজেন্ট, তা খতিয়ে না দেখে প্রকারান্তরে ফেসবুকের হইচই আর তাড়িত গুজবের সহযোগী হয়ে ওঠা ঘোরতর অন্যায়। এ অন্যায়ের ফাঁদে কি পা দেব আমরা? না কান খাড়া করে, গলা চওড়া করে বলব, সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা নয়, এর আরেক নাম পাপ, মহাপাপ। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যারা মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ ঘটায়, প্রশ্রয় দেয় সাম্প্রদায়িকতাকে তারা দেশদ্রোহী। এসব দেশদ্রোহীকে পূর্ববঙ্গ এবং বাংলাদেশ বরদাস্ত করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না। কেননা, এই বিরোধই তার অস্তিত্বের প্রধানতম শক্তি। তার জাতীয় রাজনীতির সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্যও ছড়িয়ে আছে এখানে।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা