টেকসই কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তর

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২১, ২২:০৫

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই কৃষিখাদ্য ব্যবস্থাপনা দরকার। কোভিড-১৯ ও জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। কোভিড-১৯ অতিমারি আমাদের শিখিয়েছে যে, একটি জরুরি অবস্থা অপ্রত্যাশিতভাবে উদ্ভূত হতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। এমতাবস্থায় কৃষিকে টেকসই করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভঙ্গুর কৃষিখাদ্য-ব্যবস্থাকে ঠিক করার জন্য, সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে প্রত্যেকের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাবার থাকে। পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলটি আরো টেকসই, স্থিতিস্থাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।

একটি টেকসই কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যাতে বিভিন্ন ধরনের পর্যাপ্ত, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার সবার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায় এবং কেউ ক্ষুধার্ত বা অপুষ্টিতে না ভোগে।

এফএও, ২০২১-এর মতে, বিশ্বে ৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ (বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ) একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করতে সক্ষম নয়। প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ দুর্বল খাদ্য এবং সেডেনটারি (আসীন) জীবনযাত্রার কারণে অতিরিক্ত ওজনে বা স্থূলকায় ভোগে। বিশ্বের কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় বর্তমানে ১ বিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান করা হয়ে থাকে, যা অন্য যে কোনো সেক্টরের চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য এবং অর্থ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সম্পদের অ্যাক্সেসের অভাবসহ বহু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ক্ষুদ্র চাষিরা বিশ্বের খাদ্যের ৩৩ শতাংশের বেশি উত্পাদন করেন। অপর্যাপ্ত ফসল কাটা, হ্যান্ডলিং, স্টোরেজ ও ট্রানজিটের কারণে বিশ্বের ১৪ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয় এবং ১৭ শতাংশ ভোক্তা পর্যায়ে নষ্ট হয়। বিশ্বের জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ শহরে বসবাস করে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এটি ৬৮ শতাংশে উন্নীত হবে। ১০ শতাংশ মানুষ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী বা রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দূষিত অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহে আক্রান্ত হয়। সুতরাং একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা একান্ত দরকার।

সুশীল সমাজ তথা সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) খাদ্যব্যবস্থা পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সুশীল সমাজ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত পরিবর্তনের একাধিক এজেন্টকে একত্র করার ক্ষমতা রাখে। প্রচারাভিযান, ইভেন্ট ও নেটওয়ার্কগুলিকে একত্র করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হতে সাহায্য করতে পারে। ক্ষুদ্র চাষি, আদিবাসী, নারী, যুব ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর মতামত বিবেচনায় রাখতে পারে। খাদ্যব্যবস্থাকে টেকসই করতে সুশীল সমাজকে ন্যায়সংগত, বৈধ ও স্বচ্ছ সরকারি নীতি এবং সিদ্ধান্ত  গ্রহণের জন্য অ্যাডভোকেসি করতে পারে। পুষ্টি ও টেকসই কৌশলের প্রচারের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। সব বয়সের মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ এবং খাবারের অপচয় কমাতে উত্সাহিত করতে পারে। পুষ্টি থেকে শুরু করে টেকসই উত্পাদন, ফসল কাটার পরে ক্ষতি হ্রাস, কৃষি-ব্যবসায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, এবং ফসলের জাতগুলি জলবায়ুু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিরোধী করতে সুশীল সমাজ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষক প্রাকৃতিক সম্পদের অভিভাবক হিসেবে কৃষিখাদ্য-ব্যবস্থা রূপান্তরের শিকড় হিসেবে কাজ করতে পারে। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, অর্থ, প্রণোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কৃষকদের স্থানীয় এবং বিশ্বব্যাপী টেকসই স্বাস্থ্যকর খাদ্য সরবরাহ করতে সাহায্য করতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবা বা কৃষক মাঠ স্কুলে সংযুক্ত থেকে প্রাকৃতিক সম্পদকে আরো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে। সমন্বিত ফসল-প্রাণিসম্পদ-বনায়ন-মত্স্যব্যবস্থা তথা ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং সিস্টেম গড়ে তুলতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে। খাদ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনয়নের জন্য কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। কৃষকদের সংগঠন তৈরি করে বা সমবায়গুলিতে যোগদান করে ক্ষুদ্র চাষি নিজেদের ক্ষমতায়ন করতে পারে। এখানে প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা অর্থায়নে অ্যাক্সেস এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকে।

সরকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ উন্নত নীতি বা আইন, বিনিয়োগ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টেকসই কৃষিখাদ্য-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে পরিবর্তন সাধন করতে পারে। বৈচিত্র্যই জীবনের মূল বিষয়। পুষ্টি সচেতনতা, শিক্ষা ও রন্ধনদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নতুন নিয়ম ও উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন খাবারের প্যাকেজে লেবেলিং থাকা অত্যাবশ্যক হওয়া উচিত। বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ খাদ্য বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সরকার সংগ্রহস্থল সুবিধা, রাস্তাঘাট, বাজার এবং বাজার তথ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে পারে, যাতে ফসল কাটার পরে খাদ্য অপচয় হ্রাস পায়। লজিস্টিক সাপোর্ট, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ দিয়ে সরবরাহ চেইনকর্মীদের ক্ষমতায়ন করতে পারে। খাদ্যের অপচয় কমানোর জন্য ভোক্তাদের সচেতনতা তৈরি করা এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিতে পারে।

প্রাইভেট কোম্পানিগুলিকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাইভেট কোম্পানি সবার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার উত্পাদন বা প্রচার করতে সাহায্য করতে পারে, যা টেকসই স্বাস্থ্যকর ডায়েটে অবদান রাখবে। খাদ্যব্যবস্থার পরিবেশগত প্রভাব কমাতে খাদ্য ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো কৃষকদের টেকসইভাবে খাদ্যপণ্য উত্পাদনে সহযোগিতা করতে পারে। খাদ্য প্রস্তুতকারক এবং ক্যাটারিং শিল্প খাদ্যনিরাপত্তা এবং গুণমান উন্নত করতে পারে। খাদ্য সংস্থাগুলিকে স্বচ্ছ হতে হবে এবং গ্রাহকদের কাছে পণ্য ও পুষ্টির তথ্য পরিষ্কার করতে হবে। টিভি, রেডিও, বিলবোর্ড, ম্যাগাজিন এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। খাবারের ক্ষতি এবং অপচয় কমাতে হোটেল, ক্যাটারিং এবং আতিথেয়তা খাতের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। খাদ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে উত্পাদন, অবশিষ্টাংশ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি উইন-উইন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। নারী ও যুবকরা কৃষি এবং খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ অ্যাক্টর। তাদেরকে প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষায় আরো ভালো প্রবেশাধিকার দেওয়া দরকার।

গবেষণা এবং উদ্ভাবন পরিবর্তনের পথ দেখায়। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিজ্ঞান এবং প্রমাণভিত্তিক জ্ঞানের অনুশীলন বাড়াতে হবে। এটি জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে, এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থাকে আরো স্থিতিস্থাপক করার কৌশল শিখাতে সাহায্য করবে। সংকট মোকাবিলায় এসব জ্ঞান সরকারের নীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। কৃষিখাদ্য-ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের রূপান্তর করার কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান দিতে পারে। গবেষক ও শিক্ষকদের আরো সক্রিয়ভাবে মালটি-স্টেকহোল্ডার প্রসেস এবং ডায়ালগগুলিতে জড়িত হওয়া দরকার। কোভিড ১৯-এর মতো খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একাডেমিয়া এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

n লেখক :এফএও এবং ইউএনডিপির সাবেক কনসালটেন্ট ও সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি)