এই তো জীবন। যে জীবন কখনো মূল্যবান হয়, আবার কখনো মূল্যহীন হয়। রঙ্গমঞ্চের এই জীবন সময়ের হাতে বন্দি হয়। সময়ের নিস্তব্ধতায় ডুবে গিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। সব যেন সময়ের বিচিত্র খেলা। যেখানে সময়টা খুব অদ্ভুত চরিত্রের হয়। খুব চেনা চেনা মনে হয়, তার পরও অচেনায় থেকে যায়। অনেকটা অচিন পাখির মতো। যাকে ধরব ধরব বলে আর ধরা হয় না কখনো। আসলে বিষয়টা অনেকটা ঘুমন্ত স্বপ্নের মতো। যতক্ষণ ঘুমের ঘোরে মানুষ স্বপ্নটা দেখতে থাকে ততক্ষণ সেটা জীবন্ত থাকে, দগদগে কাঁচা ঘায়ের মতো থাকে। অথচ ঘুম ভেঙে গেলে স্বপ্নটাও উবে যায়। মনে হবে হবে বলে মনে হয় না আর কখনো। নিজেকে চিন্তার অতল গভীরে তলিয়ে দিয়েও আর স্বপ্নটার কাছে পৌঁছানো যায় না ।
হয়তো এটাই প্রকৃতির নিয়ম, যা প্রকৃতি ইচ্ছে করেই মানুষকে কখনো জানতে দেয় না। ভাবা যায়, কত অদ্ভুত খেলার পণ্য হয়ে আমরা বেঁচে থাকি পৃথিবীতে। যেখানে দেখাটা কখনো দেখা হয়ে ওঠে না। যেখানে জানাটা কখনো জানা হয়ে ওঠে না। সময়টাও ঠিক স্বপ্নের মতো। যতক্ষণ মানুষ সময়ের সঙ্গে চলে ততক্ষণ মানুষ সময়কে জানতে পারে। জীবনকে বুঝতে পারে। ঠিক কতটা জানতে পারে, কতটা বুঝতে পারে সেটা বলাটা খুব কঠিন। যেমন কঠিন ভবিষ্যতের সময়কে জানা। অনিশ্চিত জীবনকে চেনা। একটা ঘর যখন আলোতে আচ্ছাদিত থাকে তখন সবকিছু দেখা যায়। সবাই সবকিছু দেখতে পায়। যেখানে সবাই সবকিছু দেখতে পায়, সে দেখাতে মূল্য নেই। ঠিক বিপরীতভাবে বিষয়টি ভাবা যায়। একটা নিকষ কালো অন্ধকারে আচ্ছাদিত ঘর। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু কেউ কেউ অন্ধকারেও দেখতে পাচ্ছে। এমন দেখাটা অমূল্য হয়।
জীবনটাও অনেকটা এমন, যেখানে সময় জীবনকে একটা অন্ধকার জায়গায় ছেড়ে দেয়। সে অন্ধকারের মধ্যেও যারা জীবনের পথ খুঁজে পায় তারা জীবনবোধের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। তখন অন্ধকার ও অনিশ্চিত সময়কেও মানুষ দেখতে পায়। সবাই এমনটা পারে না। যাদের মধ্যে একটা ভালো মানুষ বাস করে, তারাই এমনটা পারে। ভালো মানুষের মধ্যে বাস করে ভালো একটা মন। যে মন সময় হয়ে যায়। যে মন প্রকৃতি হয়ে যায়। এ সময়ে এসে ভালো মানুষ ও ভালো মন কারো কারো কাছে তত্ত্বকথার মতো মনে হতে পারে। কারণ মানুষ যখন বস্তুবাদী হয়ে যায় তখন সবকিছুকে তত্ত্বকথা হিসেবে দেখে। এর বাইরেও যে পৃথিবীটা আছে তা দেখার মতো অন্তর্নিহিত শক্তি থাকে না। কারণ মানুষ সূর্যের সামনের ঝলমলে আলো দেখলেও সূর্যের পেছনটা কখনো দেখে না। সিগমুন্ড ফ্রয়েড লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাকিরা যখন অন্ধকারের মধ্যে ঘুমাচ্ছিল, তখন তিনি একা জেগে উঠেছিলেন। সময়ের আগে ঘুম ভেঙেছে তার।’ আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগের কথা।
তখন তো অনেক মানুষ পৃথিবীতে ছিল। সবাই চোখের আলোয় পৃথিবীকে দেখলেও মনের আলোয় দেখেছিল কেউ কেউ। তাদের মধ্যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ছিলেন অন্যতম। হয়তো তার দেহের জন্ম হয়েছিল ৫০০ বছর আগে; কিন্তু তার মন তখনকার সময়কে অতিক্রম করে জন্মেছিল আরো ৫০০ বছর পরে। কিংবা তারও অনেক পরে। তা না হলে ৫০০ বছর আগেই তিনি কীভাবে ভেবেছেন রোবট, ফ্রিজ, গাড়ি এমনকি উড়োজাহাজের কথা। খুব বিস্ময়কর বিষয় হলো এর কোনো কোনোটি তিনি নিজে তৈরিও করেছিলেন। মানবদেহ এবং রোগ নিয়েও তার গবেষণা ভাবনা ছিল অভূতপূর্ব। তার শিল্পের নান্দনিকতা, তাও ছিল মহামূল্যবান। তবে একাকিত্বও ছিল তার জীবনে। সে একাকিত্ব তার মধ্যে নেতিবাচকতা তৈরি করতে পারেনি বরং তা ইতিবাচকতার শক্তিতে জীবনকে বুঝেছে জীবনের মূল্য দিয়ে।
তাহলে সময় কখনো কখনো মানুষের সঙ্গে চলতে গিয়ে পিছে পড়ে যায়। জীবন তখন সময়ের হাতে বন্দি হয় না। কারণ তখন মানুষ নিজেই সময় আর প্রকৃতি হয়ে যায়। জীবন হয়ে ওঠে আরো গভীর, আরো জীবনমুখী। সে জীবনমুখী জীবন কেমন করে যেন হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের ভেতর আর বাইরে মিল-অমিলের খেলা চলছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ভেঙে পড়ছে মানবিক নগর। ইট-পাথর আর কংক্রিটের মতো জটিল হচ্ছে মানুষ। সময়টা খুব অচেনা মনে হচ্ছে। স্বপ্নটা খুব অস্থির হয়ে উঠছে। যেখানে মায়া, মমতা, ভালোবাসা, মহত্ত্ব, মহত্যাগ আর মূল্যবোধ তত্ত্বকথার অক্ষর হয়ে বইয়ের পাতায় চোখ বুজে কাঁদছে। একটা রঙিন পৃথিবী বানিয়ে মানুষ অমানুষের খাতায় নাম লেখাচ্ছে প্রতিদিন। যেখানে মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে মানুষকে বিচার করা হচ্ছে না। মানুষকে বিচার করা হচ্ছে তার টাকা, ক্ষমতা আর অনৈতিকতা দিয়ে। এক একটা প্রাচীরে পচন ধরছে, শ্যাওলা পড়ছে আর ধসে পড়ছে জীবন—যে জীবন সময়কে চেনে না, প্রকৃতিকেও জানে না; যা জানে তাও বলতে পারে না, যা জানে না তাও খুঁজে নিতে পারে না—অদ্ভুত এক জীবন। সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে; অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। বাস্তবিকই জীবন নিয়ে গর্বের কিছু নেই। পৃথিবীতে মানুষ একাই আসে, একাই চলে যায়। ধন-সম্পদ, অর্থ, অহমিকা, ক্ষমতা সবকিছু পড়ে থাকে। একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু ঘটছে। শরীরের মৃত্যুর চেয়ে আত্মার মৃত্যু ঘটছে বেশি। অথচ এমনটা তো আমরা চাইনি।
ক্যামেরাবন্দি মানুষ ছবি হয়ে যায়। সময়বন্দি মানুষ ইতিহাস হয়ে যায়। মানুষবন্দি মানুষ ক্রীতদাস হয়ে যায়। অদৃশ্য হাতে বন্দি মানুষ খেলা হয়ে যায়। খুব দর্শনতাত্ত্বিক কথাগুলো, যেগুলো মনস্তত্ত্বের ওপর জীবনের ছাপ ফেলে, যা বলতে চায় তা আর বলতে পারে না।
একটা হ্যারিকেন টিম টিম করে জ্বলছে। এটার আলো ছড়ানোর দম ততটুকু কেরোসিনের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকার লড়াই যতটুকু। কেরোসিন ফুরিয়ে গেলে আলোও হারিয়ে যায়। তখন অদ্ভুত এক আঁধার নেমে আসে পৃথিবীতে। খুব সাদামাটা একটা বিষয় হয়তো এটা, তবে এর দর্শনতত্ত্বটা খুব গভীর। যতটা গভীর, বিষয়টা ততটাই সাধারণ। বিষয়টা যত সাধারণ হয় তার গভীরতা তত বেশি হয়, বিষয়টা যত জটিল হয় তার গভীরতা তত কম হয়। মানুষের ঘটনাগুলো তো এমনই। যেখানে জীবনকে জটিল মনে হলেও মৃত্যুকে সাধারণ একটা বিষয় মনে হয়। অথচ মৃত্যুর গভীরতা জীবনের গভীরতার থেকে অনেক বেশি। এমন অনেক বিষয় জীবনে থাকে, যা পরস্পর থেকে বিপরীতমুখী থাকে, যা দরজা-জানালাগুলো খুলে দিয়ে কেমন চেনা চেনা হয়েও অচেনা থেকে যায়। আর শিখিয়ে যায় জীবনের মন্ত্র। যেমন মৃত্যুশয্যায় শিখিয়েছে আলেকজান্ডারকে। মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডার তার প্রিয় সেনাপতিকে কাছে ডাকলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনটি ইচ্ছা পূরণ করার কথা বললেন। আলেকজান্ডার বললেন, ‘আমি আমার জীবনের বিনিময়ে তিনটি বিষয় শিখেছি, সেগুলো পৃথিবীর মানুষকে জানাতে চাই। প্রথমত, আমার শবদেহ চিকিত্সকেরা বহন করবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন পৃথিবীর কোনো চিকিত্সকের পক্ষে মৃত্যুকে রোধ করা সম্ভব নয়।’ দ্বিতীয় ইচ্ছার বিষয়ে আলেকজান্ডার বললেন, ‘আমার শবদেহ যে পথ দিয়ে বহন করে সমাধিক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথের চারপাশে আমার অর্জিত ধন-সম্পদ ও অর্থ ছড়িয়ে দেবে। যাতে মানুষ বুঝতে পারে আমি আমার পুরো জীবন ধন-সম্পদের পেছনে ব্যয় করলেও মৃত্যুর পর তার কিছুই সঙ্গে করে নিতে পারছি না।’ তৃতীয়ত, ‘কফিনের বাইরে হাত বের করে রাখবে। কারণ আমি পৃথিবীকে বোঝাতে চাই, আমি পৃথিবীতে শূন্য হাতে এসেছিলাম; আবার যাওয়ার সময় শূন্য হাতেই ফিরে যাচ্ছি।’ মৃত্যু মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যা জীবন শেখাতে পারে না। অথচ জীবনের কাছে মানুষের অনেক কিছু শেখার থাকে, যা মানুষের অগোচরেই থেকে যায়। চাকচিক্যের মোহে মানুষের মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঘটে বলেই এমনটা হয় ।
তার পরও প্রাচীন জীবনের অচেনা সময় ছেড়ে মানবিক জীবনের চেনা সময়কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে উঠুক মানুষ। ঘুম থেকে জেগে উঠুক মানুষ। অন্ধকার মানেই ঘুম নয়, অন্ধকার মানেই জেগে ওঠা, মানুষের ভাবনাটা হোক এমনই। যে ভাবনাটা অসমান্তরাল, অসংলগ্ন, অবিন্যস্ত অথচ অনেক বেশি আবেগতাড়িত—যা ভাঙা যায় না। ভাঙতে গেলে বারবার গড়ে ওঠে মাথা উঁচু করে।
n লেখক :অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
