জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ, এমপি

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ২১:৪৮

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে তোফায়েল আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জনাব আজহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম ছিলেন এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৪ সনে ভোলা শহর নিবাসী সম্ভ্রান্ত বংশীয় আলহাজ মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠা কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামান (মুন্নী) পেশায় চিকিত্সক।

তিনি ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সনে ম্যাট্রিক পাশ করেন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি এবং বিএসসি পাশ করেন যথাক্রমে ১৯৬২ এবং ১৯৬৪ সনে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করেন। কলেজজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন ১৯৬২ সনে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪-তে ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র-সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫-তে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭-তে ইকবাল হল ছাত্র-সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সন পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা কর্মসূচি হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চের মধ্যে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করে গৌরবের যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল। ১৯৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ২ জুন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

আবাসিক হল ও ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সাহচর্যে আসেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ১৯৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা অতুলনীয়। ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭২-এ বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবত্কৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া’য় তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

১৪ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৩-এ নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ১৯৭৫-এ দেশের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠিত হয়। বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাঁকে প্রথমে গৃহবন্দি ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি অবস্থায় তাঁকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

১৯৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সনের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বমোট ৮বার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯২-তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পবিত্র সংবিধান থেকে কলঙ্কিত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ অপসারণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য। ১৯৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐক্যমতের সরকারে’ তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ২০১০-এ তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে ২০১৪-র ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পাদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সেই নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং নবগঠিত সরকারে সাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে পুনঃনির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ভোলা জেলার বাংলাবাজারে তাঁর মায়ের নামে তিনি স্থাপন করেছেন ‘ফাতেমা খানম কমপ্লেক্স’। রাজনীতি ছাড়াও ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরণে অমায়িক এই সংগ্রামী রাজনীতিকের পরোপকার, বদান্যতা, সাহিত্য-সংগীত ও সুকুমারশিল্পের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তাঁর মনন ও চেতনাকে মহিমান্বিত করেছে।

n লেখক : সাংবাদিক