অগ্নি

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৫৯

স্থা নীয় প্রভাবশালী হিন্দু ধনাঢ্য নারায়ণ সরকার পাশের গ্রামের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে নিজের বাড়ির পাশেই একটা হাট বসান। নাম দেন ‘নারায়ণের হাট’। সে বহুকাল আগের কথা। এখন মুসলমানদের দোকানই বেশি। এখানকার শঙ্কর ঘোষের মিষ্টির সুনাম জেলাজুড়ে। এই দোকানের ঠিক পিছনে একটা টংয়ের মধ্যে জম্বিলা বেগম অনেকদিন ধরে বসবাস করছে।

জম্বিলা বেগমের একসময় স্বামী-সংসার, ছেলেমেয়ে সবই ছিল। বাজারে একটা দোকানও ছিল। বাজারের বড় মুদি দোকানটা ছিল তার স্বামীরই। ২০০৭ সালে সিডরে গাছচাপা পড়ে মারা যায় তার স্বামী, ছেলেমেয়ে। স্বজন             হারাবার ধকল সামলে উঠতে পারেনি জম্বিলা। তার মাথাটা খারাপ হয়ে যায়। তারপর দূরসম্পর্কের ভাই আবুল বাশার তার পাশে     এসে দাঁড়ায়।

আবুল বাশার লম্বা হালকা পাতলা ধরনের লোক। নিজের টিকন বুদ্ধিতে একসময় সে বাজারের সভাপতি হয়ে যায়। সভাপতি হওয়ার পর থেকে বাজারে হিন্দুদের এত দোকান দেখে তার মনটা চিড়বিড় করতে থাকে। সারাক্ষণ জ্বালা জ্বালা লাগে। কাছে একটা মন্দির আছে। এত জায়গা নিয়ে কেন মন্দির থাকবে? সহ্য হয় না আবুলের। মনে মনে তিনি আশা বাঁধেন, একদিন ঠিকই বাজার হিন্দুশূন্য হবে।

জম্বিলা বেগমের সম্পদ কাজে লাগিয়ে আজ আবুল বাশার দিন দিন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠতে থাকে। একদিন তার মাথায় শয়তান চাপে। তার মনে হলো, সে তো এত এত সম্পদের আসল মালিক নয়। কখনো যদি জম্বিলার মাথা ঠিক হয়ে যায় তাহলে তো বাশারের আর মাতব্বরি থাকবে না। তাই একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

—এইখানে তোমার নাম লেইখা দেও তো, বুইন।

কলমের এক খোঁচায় বাশার হয়ে গেল জম্বিলা বেগমের সমস্ত সম্পদের মালিক।               আবুল বাশারের আর খুশি ধরে না। তবে কি এখন সে জম্বিলাকে ছুড়ে ফেলে দেবে? না, তা            সে করবে না।

জম্বিলা বেগমের স্বাস্থ্য ইদানীং খারাপ। সারা দিন সে শুয়েই থাকে। জম্বিলার অসুস্থতার খবর আবুল বাশারের অজানা নয়। প্রথম প্রথম বাশারও বুঝতে পারেনি। বেশ শীত শীত করছে জম্বিলার। তাই আজ সকালবেলা মন্দিরের সিঁড়ির ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছে। দূর থেকে শঙ্কর বাবুকে দেখে তাকে কাছে ডাকে জম্বিলা।

—বুঝলা, মিষ্টির দোকানদার!

শঙ্করবাবু যেন কিছু বুঝেও বুঝতে     চাইছেন না।

—কী বুঝমু?

—তুমি তো একটা গাদা। কিছু বোজো না। দেহ না আমি পোয়াতি হইছি।

—কিন্তু এই সর্বনাশটা করল কেডা?

—এইডা তো বাশাইররা...।

জম্বিলার কথার মাঝখানে বাশার এসে হাজির।

—জম্বি, বু! তোমারে কইছি না তুমি ঘরের বাইরে আইবা না! ঘরে যাও, তাড়াতাড়ি।

রেগে যায় বাশার। শঙ্করবাবুও রেগে আগুন।

—তুমি এইটা কী করলা, বাশার ভাই?

—কাউরে তুমি বইলো না শঙ্করদা

বলেই পায়ে জড়িয়ে ধরে বাশার।

—আমার ভুল হইয়া গেছে। ভাই কাউরে বইলো না।

—আমি সবাইরে কইয়া দিমু।

—কইয়ো না। আমারে বাঁচাও। কইলে কিন্তু...

—কী করবা?

—তোমার পোলাডারে কিন্তু মাইরা হালামু।

শঙ্করবাবুও ভয়ে আঁতকে ওঠেন। বাবু এই কথা আর কাউকে বলার সাহস করেননি।

 

জম্বিলার একটা ছেলে হয়েছে আজ তিনদিন। তাই সে অসুস্থ। শঙ্করবাবু বাচ্চার নাম রেখেছে অগ্নি। বাচ্চাটা দিন-রাত কান্নাকাটি করে। এই কান্নার আওয়াজ আবুল বাশার সহ্য করতে পারে না। বাশার নিয়মিত সংবাদ দেখে, ফেসবুক ঘাঁটে। হঠাত্ একদিন ফেসবুকে দেখতে পায়, কোনো এক হিন্দু নাকি তাদের পবিত্র গ্রন্থকে অবমাননা করেছে! অবমাননার ছবি সে ফেসবুকে দেখতে পায়। বাশার মনে মনে ভাবে এটাই বুঝি তার মনোবাসনা পূরণ করার উপযুক্ত সময়। পরের দিন দেশের বিভিন্ন জেলায় মুসলমানরা পবিত্র কোরআনকে অবমাননা করার প্রতিবাদে  হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং মন্দির, মূর্তি প্রভৃতি ভাঙচুর করে। বাশারের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বাজারের সব মুসলিম দোকানদারকে একত্র করে তাদের উদ্দেশ্যে একটা জ্বালাময়ী ভাষণ দেয়।

আবুল বাশার যেন হ্যামিলনের   বাঁশিওয়ালা আর সকলে যেন ইঁদুর। হাতের কাছে যে যা পেয়েছে তা নিয়ে শুরু করে দেয় ধ্বংসলীলা। ভাঙা হলো হিন্দুদের দোকানপাট। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। শঙ্করবাবু  তাঁর দোকান বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই                করলেন না। সব চোখের সামনে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ঠিক করলেন, মরতে তো হবেই; তবে মরার আগে সত্য কথাটা সবার  জানা উচিত।

—বাশারই হইলো জম্বিলার পোলার বাপ।

শঙ্করবাবু বারবার বলে যাচ্ছেন এই কথা। কেউ কেউ শুনল, কেউ আবার শুনল না। কিন্তু বাশারের কানে ঠিকই শঙ্করবাবুর কথা পৌঁছাল। বাশার তার হাতে থাকা শাবল ছুড়ে মারল শঙ্করবাবুর দিকে। শাবলটা ডান চোখ দিয়ে ঢুকে পিছনের দিকে বেরিয়ে গেল। তবুও শঙ্করবাবু বলে যাচ্ছে। মরার আগে অন্তত একটা সত্য কথা প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি।

—বাশারই হইলো জম্বিলার পোলার বাপ।

আগুন জম্বিলার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। আধাপোড়া অবস্থায় জম্বিলা ভয় পেয়ে তার ছেলেকে নিয়ে দৌড়ে আশ্রয় নিল মন্দিরের ভিতরে। অগ্নিকে সে সজোরে চেপে ধরেছে বুকের সঙ্গে। কোনোভাবেই ছেলেকে মরতে দেবে না। বাশার ভেবেছিল জম্বিলা ও তার ছেলে টংয়ের মধ্যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে পড়ল মন্দির পর্যন্ত। আবুল বাশার নিজের হাতে মন্দিরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। মন্দিরের ভিতর থেকে সে অগ্নির কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। আর জম্বিলার চিত্কারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। মন্দির পুড়ে ছাই! এখন আর কারো কান্নার শব্দ নেই!

বাশার পৈশাচিক উন্মাদনায় মেতে ওঠে। আজ যেন তার মহাসুখের দিন। বাশারের উল্লাসধ্বনি জম্বিলার কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চেতনা ফিরে আসে জম্বিলার। মন্দির থেকে দৌড়ে বের হয়ে বাশারের সামনে দাঁড়ায় সে। তার একহাতে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া অগ্নি আর একহাতে একটা দা। ডান হাতে থাকা দা দিয়ে একটা কোপ বসিয়ে দেয় আবুল বাশারের কপালের ঠিক মাঝখানে। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে আবুল বাশার। জম্বিলার চোখে আজ বিজয়ের আনন্দ। মুখে থেকে তার ঝরে পড়ে ঘৃণাভরা উক্তি।

—শালা ভণ্ড!

অগ্নির ছাইভস্ম বুকে জড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জম্বিলা।

[বাবুগঞ্জ, বরিশাল]