বিশ্বে অ্যানিমেশনের ইতিহাস অনেক পুরনো। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের ইতিহাসও তাই। ১৯০৬ সালে জে স্টুয়ার্ট ব্ল্যাকটন বানিয়েছিলেন ‘হিউমারাস ফেইজেস অব ফানি ফেইসেস’ (১৯০৬)। দুই বছর পর এমিল কোল বানান ‘ফ্যান্টাস্মাগোরি’ (১৯০৮), যেটাকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম অ্যানিমেটেড কার্টুন। পরের দশকে ‘গার্টি দ্য ডাইনোসর’ (১৯১৪) রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে। বদলে যায় অ্যানিমেশনশিল্প। বিশের দশকে আবির্ভাব হয় ওয়াল্ট ডিজনির। ত্রিশের দশকে তিনি শুরু করেন পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র বানানো। হলিউডের সেই ধারা অব্যাহত আছে এখনো। নব্বইয়ের দশকে তার সঙ্গে যুক্ত হয় জাপানি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। বিশেষ করে বলতে হয় হায়ায়ো মিয়াজাকি ও তাঁর স্টুডিও ঘিবলির নাম। তাদের পাশাপাশি এখন বিশ্বের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় রাজত্ব করছে পিক্সার, ড্রিমওয়ার্কস অ্যানিমেশনের মতো স্টুডিওগুলো।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের চেয়ে অখণ্ড বাংলার চলচ্চিত্রশিল্প খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। হীরালাল সেন শুরুটা করেছিলেন উনিশ শতকের গোড়াতেই। কিন্তু ঢাকা তথা বাংলাদেশ সে বাবদে অনেক পিছিয়ে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় নানা টানাপড়েনে দীর্ঘ সময় এখানে চলচ্চিত্র নির্মিতই হয়নি। যদিও দর্শকের অভাব ছিল না কখনোই। অবশেষে যাত্রাটা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে। ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৭) দিয়ে। আর প্রথম অ্যানিমেশনের ব্যবহার হয় আরো কয়েক দশক পরে। সে কৃতিত্ব চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবিরের। ‘সূর্যকন্যা’ (১৯৭৭) চলচ্চিত্রে তিনি দেড় মিনিটের একটি সাদা-কালো অ্যানিমেটেড সিকোয়েন্স ব্যবহার করেন। তাতে তুলে ধরা হয়েছিল কীভাবে প্রাচীন কৃষিনির্ভর নারীপ্রধান সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরুষের কর্তৃত্ব। অ্যানিমেশন করেছিলেন কলকাতার প্রতিভাবান শিল্পী মন্দার মল্লিক।
কিন্তু তার ধারাবাহিকতায় পরে আর কিছুই হয়নি। ফলে সেটা একটা বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা হিসেবেই থেকে গেছে। নব্বইয়ের দশকে কার্টুন সিরিজ ‘মীনা’ নির্মিত হয়। এই শতকের প্রথম দশকেও অ্যানিমেশনে কয়েকটি কাজ হয়। সম্প্রতি সেসবের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অ্যানিমেশন স্টুডিও। কিন্তু সবই মূলত টেলিভিশন বা নিউ মিডিয়ার জন্য। কিছু উল্লেখযোগ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। বিশেষ করে বলতে হয় ‘টুমরো’র (২০১৯) কথা। মো. শিহাব উদ্দিন পরিচালিত ছবিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে। তবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস সেভাবে দেখা যায়নি।
অবশেষে সে আক্ষেপও ঘুচল। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। ‘মুজিব আমার পিতা’ (২০২১)। কাহিনি নেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রচনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ থেকে। পরিচালনা করেছেন সোহেল মোহাম্মদ রানা। নির্মাণ করেছে প্রোলেন্সার স্টুডিও। অর্থায়ন করেছে আইসিটি ডিভিশন। তুলে ধরা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ছেলেবেলা, স্কুলজীবন, কলকাতার ছাত্রজীবন, সেখানে দাঙ্গার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়, দেশভাগ, ন্যায্য আন্দোলনের খেসারত হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব খোয়ানো থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের দিনগুলোর কথা। বানানো হয়েছে দ্বিমাত্রিক বা টুডি অ্যানিমেশন মাধ্যমে। ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি অ্যানিমেশনের চেয়ে এটি তুলনামূলক বেশি পরিশ্রমের। খরচও বেশি। কিন্তু শৈল্পিক উত্কর্ষে এর তুলনা নেই। কারণ এতে প্রতিটি ফ্রেম হাতে আঁকতে হয়। অর্থাত্ প্রতি সেকেন্ডের জন্য অন্তত ১২টি করে।
চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহার করা হয়েছে তিনটি গান। তার মধ্যে একটি লোকসংগীত (আমার মন যে কাঁদে রে), আরেকটি রবীন্দ্রসংগীত (তোমার অসীমে)। অন্যটি (তোমার সমাধি) একটি পুরনো ছবির গান। তবে ‘অন্তরাল’ (১৯৬৫) চলচ্চিত্রের জন্য সেটির কেবল প্রথম চারটি চরণ লেখা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের শহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশে এসেছিলেন গানটির শিল্পী শ্যামল মিত্র। দেখা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর। তখন তিনিই অনুরোধ করেছিলেন গানটি শেষ করতে। তাঁর কথা মাথায় রেখেই বাকি চরণগুলো লেখেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
তবে চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যানিমেশনের সমস্ত কাজ করেছেন দেশীয় শিল্পীরা। ‘সূর্যকন্যা’য় যেটি ছিল অনুপস্থিত। কাজেই এবার সম্ভাবনা রয়েছে এর ধারাবাহিকতায় দেশে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের ধারা তৈরি হওয়ার। প্রয়োজন কেবল পৃষ্ঠপোষকতার। যেমনটা পেয়েছেন ‘মুজিব আমার পিতা’র পরিচালক সোহেল মোহাম্মদ রানা ও তার প্রোলেন্সার স্টুডিও। এবং আস্থার প্রতিদান দিয়ে গড়েছেন ইতিহাস। বড় পর্দায় প্রথমবারের মতো দেখিয়েছেন দেশের অ্যানিমেশন। এই শুরু হোক ভীষণ সম্ভাবনার!
