সড়কে মৃত্যুর মহামারি আর কত দিন?

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২১:১৮

পত্রপত্রিকা কিংবা টিভি চ্যানেলগুলির সংবাদে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার কিছু না কিছু খবর দেখা যাইবেই। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে, সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইতেছে; আর দুর্ঘটনার কারণে প্রতিদিন গড়ে আহত হইতেছে ১৫০ জনেরও অধিক মানুষ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণে বত্সরব্যাপী লকডাউনে পরিবহন তেমনভাবে না চলিলেও ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন নিহত আর ৮ হাজার ৬০০ জন আহত হইয়াছে। এমনই বাস্তবতায় প্রতি বত্সর ২২ অক্টোবর সরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভাবে পালন করা হয় নিরাপদ সড়ক দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে যাত্রী, চালকসহ জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনকানুন মানিয়া চলিবার বিষয়ে সকলকে উদ্বুদ্ধ করিবার লক্ষ্যেই দিবসটি পালন করা হইয়া থাকে। কিন্তু দিনদিন যেইভাবে সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত হইতেছে, দুর্ঘটনায় আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীর সংখ্যা বাড়িতেছে, তাহাতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতার বিষয়টি এবং এই ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হইতেছে।

আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে যেই সকল কারণকে দায়ী করা হয় তাহার মধ্যে রহিয়াছে—চালকের অসতর্কতা, জনসাধারণের অসচেতনতা, বেপরোয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং, ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ইত্যাদি। ইহা বহুল আলোচিত বিষয়, আর ইহা লইয়া বিস্তর গবেষণা, সভা-সমাবেশও হইয়াছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করিয়াছে, যাহা ১ নভেম্বর ২০১৯ হইতে কার্যকর হইয়াছে। এই আইনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হইল—দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান, যথাযথ প্রক্রিয়া মানিয়া নিবন্ধন সনদ না লইয়া রাস্তায় নামিলে জরিমানা কিংবা কারাদণ্ড, গাড়ি চালাইবার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইবার জন্য অষ্টম শ্রেণি পাশ, যানবাহনগুলির সংকেত মানিবার পাশাপাশি সাধারণ পথচারীদেরকেও জেব্রা ক্রসিং, পদচারী সেতু আর পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়া পার হওয়া এবং নিয়ম না মানিলে জরিমানার বিধান ইত্যাদি। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এত সভা-সমাবেশ, সেমিনার, আলোচনা এবং কঠোর আইন করিবার পরও সড়কে কোনোভাবেই শৃঙ্খলা ফিরিতেছে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ লইয়া রহিয়াছে বিস্তর সমালোচনা। আইন করিবার পর তাহা যদি কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করা হয় তাহা হইলে বিষয়টি প্রহসনে পরিণত হয়। সড়কে প্রতিদিন দুর্ঘটনার বিষয়টি এতটাই গা-সওয়া ব্যাপারে পরিণত হইয়াছে, সাধারণ মানুষ হইতে শুরু করিয়া দায়িত্বশীল কেহই যেন বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করিতে পারেন না। অথচ অন্য বিশেষ কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনায় দিনে যদি ৬০ হইতে ৭০ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করিত, তাহা হইলে দেশে বিশেষ সতর্কতামূলক অবস্থা জারি করিবার উপক্রম হইত। আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করিতে হইবে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ নিহত হইবার বিষয়টি কোনো মহামারির তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নহে।

সড়ক-মহাসড়কে অকালমৃত্যু কাহারোই কাম্য নহে। একটি মৃত্যু একটি পরিবারের নিকট সারা জীবনের জন্য গভীর ক্ষতের কারণ হইয়া থাকে। প্রতিনিয়ত মহামারির ন্যায় বাড়িয়া চলা সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করিতে আমাদের আর বসিয়া থাকিলে চলিবে না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেক সুপারিশ রহিয়াছে, সেই সকল সুপারিশ বাস্তবায়নে বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হইতে হইবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করিতে হইবে সড়ক পরিবহন আইনের কঠোর প্রয়োগ। ইতিপূর্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীও বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়াছেন, সেই সকল নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারি কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীসাধারণ সকলকেই সম্মিলিতভাবে কাজ করিতে হইবে। নিরাপদ সড়কের জন্য সমন্বিত একটি কার্যকর কৌশল প্রণয়ন এবং তাহা বাস্তবায়নে নিশ্চিত করিতে হইবে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়বদ্ধতা।