নানা রঙের পাখি। মিষ্টি স্বরে ডাকে। উড়ে বেড়ায়। খাঁচার ডিম বাচ্চা করে। সেখানেই বড় হয়। কেউ শখে, কেউবা অবসর সময়কে সুন্দরভাবে কাটাতে পাখি পোষে। কেউ কেউ ব্যবসায়িকভাবে। গত এক যুগ ধরে দেশে পোষা পাখির প্রসার ঘটছিল। এর মধ্যে অনেক অর্জনও আছে। বিরল প্রজাতির পাখি দেশি অনেক ব্রিডার ডিম, বাচ্চা করাতে পেরেছেন। বিশ্বমানের কিছু পাখি দেশে উত্পাদিত হয়েছে। পাখি রফতানির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল। প্রতিবেশী অনেক দেশ পাখি রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। পোষা পাখির চাহিদা বিশ্বব্যাপী। দেশি ব্রিডারারা রাত-দিন পরিশ্রম করেছেন। লোকসানও দিয়েছেন। শুধু এই শিল্পটাকে দাঁড় করানোর জন্য। অর্থনৈতিক দিক তো আছেই। পোষা পাখির সামাজিক সুফল ব্যাপক। নেশা করত, পাড়া-মহল্লার মোড়ে আডডা দিত—এমন ছেলেরা পোষা পাখি পেলে জীবন পরিবর্তন করেছে। বদলে গেছে তাদের জীবন। ধীরে ধীরে যখন পোষা পাখির প্রসার ঘটছিল, তখনই অসাধু মহলের চোখ পড়ে। তারা এই সুন্দর শখটাকে গলা টিপে হত্যা করতে নেমেছে। কুচক্রীমহল পোষা পাখি পালতে লাইন্সেস লাগবে এমন ধুয়া তোলে। দেশে এই শিল্পের আরো প্রসার হোক। তারপর যুগোপযোগী বিধিমালা—এমনটাই পোষা পাখিপ্রেমিরা চান। ছোট থাকতেই এই শৌখিন কাজকে থামিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। বিধিমালায় এমন কিছু ধারা আছে, যা শতভাগ বাস্তবতা বর্জিত। যেমন দশটির বেশি পাখি থাকলে লাইসেন্স ফি দিতে হবে। ন্যূনতম পোষা পাখি সম্পর্কে ধারণা থাকলে এই ধারা কোনোভাবেই হতে পারত না। কারণ পাঁচ জোড়া বাজরিগার পাখি বছরে নিম্নে ২০টি বাচ্চা দেয়। যেখানে দরকার দেশি ব্রিডারদের সরকারি সহায়তা, সেখানে আইন করে পাখি পুষতে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে।
পোষা পাখি যদি শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশ তখন মিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। সারা বিশ্বেই পোষা পাখির বড় বাজার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচুর চাহিদা আছে। সুসংবাদ হলো, এ দেশের ব্রিডাররা ম্যাকাওয়ের মতো দামি পাখি অহরহ ব্রিড (ডিম, বাচ্চা ) করাচ্ছেন। আবার ফিঞ্চ প্রজাতির দুলর্ভ পাখি মানিকগঞ্জের আবদুল হান্নান দিনার ডিম, বাচ্চা করে চমক সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব বিখ্যাত ব্রিডারদের প্রশংসা পেয়েছেন। শ্রমিক সস্তা এবং আবহাওয়া—এ দুটি কারণে পোষা পাখি উত্পাদনে বাংলাদেশ খুব ভালো করতে পারে। বাংলাদেশে আগে কম-বেশি পোষা পাখি আমদানি হতো। কিন্তু ইদানীং বানের জলের মতো পাখি আসছে। চোরাইপথে নিম্নমানের পাখি যেমন আসছে, আবার বৈধভাবে দেদারছে আসছে বন্য পাখি। বন্য পাখি বলতে যে পাখি খাঁচায় পালা নিষেধ। ফলে দেশি পাখি পালকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আবার সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। যে পাখি বাংলাদেশে প্রচুর উত্পাদিত হয়, যে পাখি খাঁচায় পালা বৈধ না। অবিলম্বে সে পাখিগুলোর আমদানি বন্ধ করতে হবে। যদি আমরা পোষা পাখিকে আর দশটা শিল্পের মতো দেখতে চাই। বাংলাদেশ হয়েও অন্য দেশে পোষা পাখি যায়। এটাও বন্ধ করতে হবে। যেভাবে যে প্রক্রিয়া ফলো করে আমদানি করতে হয়, সেটাও মানা হয় না। আমদানি বন্ধ নয়, বরং পোষা পাখিপ্রেমিবান্ধব আমদানি হতে পারে। দুলর্ভ প্রজাতির পাখি, যেগুলো নিয়ে দেশি ব্রিডাররা কাজ করতে পারেন। সেগুলো সীমিত আকারে আমদানি হলে দোষ নেই। কিন্তু যে পাখি দেশেই প্রচুর উত্পাদিত হচ্ছে, সেগুলো আমদানির অনুমতি দেওয়া মানে দেশি ব্রিডারদের পথে বসানো।
সবকিছু বিবেচনায় সরকারের কাছে আকুল আবেদন, পোষা পাখি শিল্পটাকে বাঁচান। চোরাপথে পাখি আসা বন্ধ করুন। এখন নয়। আরো প্রসার ঘটুক। তারপর যুগোপযোগী আইন হলে আপত্তি নেই।
ঢাকা
