সুরাইয়া ইয়াসমিন তিথি
কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষার ধারণা মূলত পেশাগত কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। মূলত এটি এক ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষা, যা শিক্ষার্থীর কর্মদক্ষতা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল ও উত্পাদনমুখী করে তোলে। কর্মক্ষমতা সৃষ্টি করে তাকে কর্মমুখী উপার্জনমূলক জনশক্তিতে রূপান্তর করা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে শিক্ষার্থীকে পরিচয় করানো এবং তার সুপ্ত গুণাবলিকে জাগানো।
আমাদের দেশের জনশক্তির একটি বড় অংশই হচ্ছে বয়সে তরুণ আর এদের কাজে লাগাতে হলে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নাই। আমাদের দেশের বিদেশগামী লোকের অধিকাংশই অনভিজ্ঞ, এতে করে তারা নিম্ন বেতনে কাজ করে। এই অভিবাসী শ্রমিকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জীবন-জীবিকার আয়-উন্নতির ব্যাপক পরিবর্তন করা সম্ভব। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে কর্মমুখী শিক্ষা অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। এ যুগে কর্মমুখী শিক্ষা অপরিহার্য।
আমরা দেখছি যে, যেসব দেশ কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, তারাই এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। সুতরাং আমাদেরও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে। শুধু তাই নয়, কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে জটিল সমস্যা সমাধানের মনোভাব ও দক্ষতা তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক হয়ে উঠতে পারে। যার সূচনা পর্ব হলো কর্মমুখী শিক্ষা।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন কর্মমুখী শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, তখন আমরা এদিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছি। কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না কার্যক্ষেত্রে। অথচ দেশের সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট নিয়েও অসংখ্য শিক্ষিত যুবক ঘুরছে চাকরির বাজারে। মেধার সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট থাকার পরও শুধু কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে তাদের থাকতে হচ্ছে বেকার। এটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যকে প্রমাণ করে। এর বিপরীতে রয়েছে নতুন পদ সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতাও। ফলে দেশের শিক্ষিত বেকাররা ব্যর্থতা ও হতাশায় আক্রান্ত হয়ে বিপথে যাচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে অপরাধের সংখ্যাও। গতানুগতিক গ্রন্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রিধারী শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরি করছে বটে; কিন্তু তা কর্মভিত্তিক না হওয়ায় ফলপ্রসূ হয়ে উঠছে না। বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। এ অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা।
কর্মমুখী শিক্ষা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনে এ শিক্ষা সহায়ক। শিক্ষার মধ্য দিয়েই দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের মধ্য দিয়েই এ দেশ হতে পারে স্বনির্ভর। কর্মমুখী শিক্ষা না থাকলে কোনো দেশে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করা যায় না। সারা পৃথিবীতে যে দেশ যত বেশি দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে সে দেশ তত বেশি শিল্পোন্নত। কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব আজ সর্বত্র স্বীকৃত। কারিগরি শিক্ষা না থাকলে জনশক্তিকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে প্রচুর জনশক্তি থাকলেও কারিগরি প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা না থাকলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। জাতীয় জীবনের উন্নতির স্বার্থে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে ডিগ্রি অর্জনের মোহ কাটাতে হবে। বিপুল সংখ্যক জনশক্তিকে উপযুক্ত কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উত্পাদনমুখী কাজে ব্যবহার করতে পারলেই রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
