মিরসরাইয়ে বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে খাবার

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২১:৫৩

মোহাম্মদ ইউসুফ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অবস্থিত বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে খাদ্যপণ্য। অধিকাংশ বেকারির নেই ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, স্যানিটারি ও ট্রেডমার্ক ছাড়পত্র। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে এসব বেকারি। মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বেকারিগুলোতে প্রশাসনের অভিযান হয় বিধায় এখন প্রত্যন্ত বাজারে বেকারি স্থাপন করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব বেকারিতে উত্পাদিত খাদ্যপণ্য গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন হাটবাজারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিম্নমানের উপকরণে উত্পাদিত খাদ্যপণ্য খেয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

মিরসরাই উপজেলা স্যানিটারি ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক শংকর প্রসাদ বিশ্বাস বলেন, উপজেলায় ২০টি বেকারি রয়েছে। এর মধ্যে ৯টিতে খাদ্য তৈরি হয় ওভেনে। বাকি ১১টিতে তৈরি হয় হাতে। এসব বেকারির পণ্য উপজেলার ৪৫টি বাজারের অন্তত ১ হাজার ৩৭৫টি প্রতিষ্ঠান ও ২৪টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় যাচ্ছে।

গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ৫০ জনকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একটি বেকারি চালুর আগে ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, স্যানিটারি ও ট্রেডমার্ক ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। তবে উপজেলার বেকারিগুলোর অধিকাংশই এই নিয়মের তোয়াক্কা করছে না।

উপজেলার করেরহাট বাজারে রয়েছে সুরভি বেকারি, আজমীর বেকারি, বাদামতলী ঢাকা বেকারি। এছাড়া জোরারগঞ্জ বাজারে বার আউলিয়া বেকারি, ঠাকুরদীঘি বাজারে শুভপুর বেকারি, বামুন সুন্দর দারোগার হাটে আলাউদ্দিন বেকারি, আল্লাহর দান বেকারি, সুফিয়া রোডে নিউ মদিনা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট, নিউ সেফ ফুড, নিউ মক্কা, নিউ মুরাদ বেকারি, বারইয়ারহাটে বিসমিল্লাহ বেকারি, আবুতোরাব বাজারে রাহাত ফুড প্রোডাক্টস, বিষু মিয়ার হাটে মাহি বেকারি, কমর আলী বাজারে ইসপা বেকারি, মিরসরাই নিউ ঢাকা বেকারি, দারোগারহাটে রাজ বেকারি, মিরসরাই বাজারে আল আমিন, নিউ ঢাকা ফুড, নিউ মক্কা, মুরাদ বেকারিগুলোর চিত্র একই রকম। রাহাত ফুড প্রোডাক্টস, ঢাকা বেকারি, শুভপুর বেকারি, আল আমিন বেকারিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্সও নেই।

সরজমিনে উপজেলার বিভিন্ন বেকারিতে দেখা যায়, বেশির ভাগ কারখানায় কর্মচারীরা হাতে গ্লোভস ছাড়াই দুই হাতে ময়দা মাখছেন। জুতা পায়ে দিয়েই ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রকমের পণ্য সাজিয়ে রাখছেন। অনেককে খালি গায়ে আটা-ময়দার স্তূপে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে ময়দা মাখাতে দেখা যায়। কেউ আবার ময়দার খামির মেশিনে শুকাচ্ছেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন খালি গায়ে। কারও শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। কেউ এক হাতে বিড়ি-সিগারেট ফুঁকছেন, অন্য হাত দিয়ে কাজ করছেন। খোলা তেল ভর্তি ড্রামের ওপর দেখা যায় মাছি ভনভন করছে। যত্রতত্র ইঁদুর ও তেলাপোকার বিষ্ঠা ছড়িয়ে থাকতেও দেখা যায়। খোলা পরিবেশে পণ্য তৈরির সময় ধুলাবালি পড়ছে। অধিকাংশ বেকারির ফ্লোর কাঁচা। এসব বেকারির পণ্যই বাহারি মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে। কারখানায় তৈরি বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, মিষ্টির মতো খাবার এভাবেই চলে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে।

আবুতোরাব বাজারের রাহাত ফুড প্রোডাক্টসের মালিক আবুল বশর বলেন, ‘আমি বেকারি দিয়েছি মাত্র তিন বছর হয়েছে। শুধু ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স আছে। অন্য কোনো লাইসেন্স নেই। বেকারির মাল কম চলে; তাই লাইসেন্স নিচ্ছি না। সামনে নেব।’

মিরসরাই বাজারের আল আমিন বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. ইউসুফ বলেন, বর্তমানে চিনি, ময়দার দাম ও শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। স্কয়ার, প্রাণসহ বড় বড় কোম্পানিগুলোর কারণে গ্রামের ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মিরসরাই পৌরসভার ঢাকা বেকারির মালিক মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ব্যবসা শুরু করেছি ছয় মাস আগে। শিগিগরই অনুমোদনের জন্য আবেদন করব।’ উপজেলার বারইয়ারহাটের শেফা ইনসান হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এস এ ফারুক বলেন, ভেজাল কেমিক্যাল ও নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা এসব খাদ্যসামগ্রী খেলে যে কেউ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের জন্য এসব খাবার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিএসটিআই চট্টগ্রামের ফিল্ড অফিসার আশিকুজ্জামান বলেন, ‘যেসব বেকারি শর্ত মানছে না, শিগিগর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, যেসব বেকারি যথাযথ নিয়ম মেনে চলবে না, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।