অপরাধের স্বর্গরাজ্য রোহিঙ্গা ক্যাম্প

চার বছরে সংঘর্ষে নিহত ২৩৪

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৬

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন পরিণত হয়েছে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে। মিয়ানমার সরকারের ইন্ধনে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি বিপথগামী অংশ খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, অস্ত্র ও মাদক-মানব পাচার, ডাকাতিসহ নিত্য নানা অপরাধ ঘটাচ্ছে।গেল ৪৯ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৩৪ জন নিহত হয়েছে।  

জেলা পুলিশের তথ্যমতে, রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিত্য বাড়ছে। গত চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ১  হাজার ৩০০টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি হয়েছে ২ হাজার ৮৭০ রোহিঙ্গা। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক পাচার, মানবপাচার, পুলিশের ওপর হামলা ইত্যাদি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭৬টি খুনের মামলা হয়েছে চার বছরে। এ সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অন্যান্য অপরাধে হয়েছে ৮৯টি মামলা। গেল ৪৯ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় ২৩৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৩৬০ জন। ২০১৮ সালে ২০৮ মামলায় আসামি ৪১৪ জন। ২০১৯ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩টি। যার আসামি ৬৪৯ জন। ২০২০ সালে ১৮৪ মামলায়                 হয়েছে, ৪৪৯ আসামি।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার পর ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও কর্মীদের দাবি, অপরাধ জগত্ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেই ১৫-২০টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর বাইরে ক্যাম্পকেন্দ্রিক রয়েছে আরও একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রত্যেক বাহিনীতে ৩০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত সদস্য বিদ্যমান। সন্ধ্যার পর থেকে ক্যাম্পগুলো হয়ে ওঠে অপরাধের স্বগরাজ্য। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি ও খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়ে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পগুলোতে দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকলেও রাতে তা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে।

উখিয়ার রাজাপালং ইউপির কুতুপালং এলাকার সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গারা সহজে সীমান্ত পার হয়ে মিয়ানমারে যাওয়া-আসা করতে পারছে। এ কারণে ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ক্যাম্পকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে অনেক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে করে খুনাখুনি ও অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদ্য কারামুক্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক কয়েকজন শীর্ষ মাদক কারবারি বলেন, ক্যাম্পে প্রতিদিন শতকোটি টাকার বেশি ইয়াবার লেনদেন হচ্ছে। হাতবদল হয় অন্তত ২৫-৩০ লাখ ইয়াবা। মূলত ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে।

ক্যাম্পে অধিক পরিচিত সন্ত্রাসী গ্রুপের মাঝে রয়েছে মাস্টার মুন্না গ্রুপ, মৌলভী ইউসুফ গ্রুপ, রকি বাহিনী, শুক্কুর বাহিনী, আব্দুল হাকিম বাহিনী, সাদ্দাম গ্রুপ, জাকির বাহিনী, নবী হোসেন বাহিনী, পুতিয়া গ্রুপ, সালমান শাহ গ্রুপ, গিয়াস বাহিনী, শাহ আজম গ্রুপ অন্যতম।

অভিযোগ আছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিক্তিক বেশিরভাগ সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিদের যোগাযোগ রয়েছে। মূলত বিশ্বের দরবারে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব করতে চায় মিয়ানমার।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, সীমান্ত এলাকা বাদ দিয়ে শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপরাধ বিরোধী অভিযানের পাশাপাশি মাদক উদ্ধার অভিযানও চালানো হচ্ছে। কক্সবাজারের ইতিহাসের ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান জেলা পুলিশ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। দায়িত্বে না পড়লেও আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।