চুরি হচ্ছে বিরাটনগরের প্রত্ন-সম্পদ!

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৫৬

রায়গঞ্জে মহাভারত খ্যাত বিরাট রাজার বিরাটনগরের মহামূল্যবান প্রত্ন-সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন ঐ শহরের ধ্বংসস্তূপের সহস্রাধিক ঢিবির মধ্যে অধিকাংশ ঢিবির স্মৃতিচিহ্ন ও প্রত্ন-সম্পদ ইতিমধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দৃর্বৃত্তরা বেপরোয়া খোঁড়াখুঁড়ি করে চুরি করে নিয়ে গেছে ইট মাটি ও প্রাচীন স্থাপনার নানা সরঞ্জাম। সিংহভাগ জায়গা-জমি বেদখলও হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও খননের অভাবে এর শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু আর অবশিষ্ট থাকছে না। ফলে কোথায় কোথায় সেই ঢিবিগুলো ছিল তা শনাক্ত করাও এখন কঠিন ব্যাপার।

পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত সূত্রমতে, বিরাট রাজার রাজধানী শহর ছিল তত্কালীন প্রমত্তা করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে (এখন মরা করতোয়া) বর্তমান ধামাইনগর ও সোনাখাড়া ইউনিয়নের প্রায় ১২ বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে। বিরাটনগরের কিঞ্চিৎ ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এখন ক্ষিরিতলা বুরুজ ও অর্জুনগড়সহ মাত্র কয়েকটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ শুধু দৃশ্যমান।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর ধামাইনগর ইউনিয়নের ক্ষিরিতলা মৌজায় এই ক্ষিরিতলা বুরুজ। বিশাল এলাকা জুড়ে বুরুজটি অবস্থিত। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখনো বেদখলমুক্ত প্রায় ৩০ বিঘা ভূমি (খাস) এখানে বিদ্যমান। সমতল ভূমির চেয়ে স্থানটি সুউচ্চ। এ কারণে এলাকাবাসী এই স্থানকে বুরুজ (উঁচুস্থান বা দুর্গ) বলে থাকে। ক্ষিরিতলা বুরুজের শীর্ষ স্থানে জন্ম নেওয়া কালের স্বাক্ষী বিশাল পাকুড় গাছের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে এখনো দেখা যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের কার্নিশ। এলাকাটি অরক্ষিত থাকায় কতিপয় দুর্বৃত্ত গুপ্ত ধনের আশায় খোঁড়াখুঁড়ি করে এর বিপুল পরিমাণ ইট চুরি করে নিয়ে গেছে। জনশ্রুতি আছে স্বর্ণ-রৌপ্যসহ এখানে অনেকেই পেয়েছে অনেক কিছু। উপজেলার ঝাপড়া গ্রামের অধিবাসী জনৈক শীতল সাহা ধনরত্ন পাওয়ার আশায় বুরুজের একাংশে খনন করেছিলেন।

সিরাজগঞ্জ মহকুমার ভূতপূর্ব মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট মি. নোলন সাহেবের আমলে ও জমিদার বনওয়ারী লালের সময়েও এই ক্ষিরিতলা বুরুজের স্থান একাধিকবার খনন করা হয়েছিল (পাবনা জেলার ইতিহাস)। এসব অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খোঁড়াখুঁড়ির ফলে পোড়ো প্রাসাদটির প্রকৃত অবস্থার চরম ক্ষতি হয়েছে।

সম্প্রতি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক রিফাত-উর-রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের একটি দল নিমগাছিসহ ক্ষিরিতলা এলাকা পরিদর্শন করেন এবং বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ করেন।

প্রত্নতাত্ত্বিক মো. রিফাত-উর-রহমান ইত্তেফাককে বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অতীত সময়কে বোঝার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সূত্রের চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন প্রত্নবস্তুর ওপর। আমরা গত চার মাস এই এলাকা জরিপ করে ইট, মৃত্পাত্রের ভগ্নাংশ, মাটির নমুনা সংগ্রহ করেছি। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক উত্খনন এবং প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া এই প্রত্নস্থলের সময়কাল সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব না। তবে প্রাপ্ত নমুনা থেকে আপাতদৃষ্টিতে ধারণা করা যায়, প্রাচীনকালে এখানে একটি অতি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এই মুহূর্তে প্রত্নস্থলটি উত্খননের জন্য বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। উত্খননের অনুমতি পেলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রত্নস্থল নিয়ে গবেষণা করতে প্রস্তুত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি একটি অসংরক্ষিত প্রত্নস্থল। যত দ্রুত সম্ভব প্রত্নস্থলটিকে সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। অনুমতি সাপেক্ষে এখানে উত্খননের ব্যবস্থা করা গেলে সুদূর অতীতের অনেক বিষয় উন্মোচিত হবে। জানা যাবে ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক অজানা অধ্যায়।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ বলেন, এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করলে তিনি তা যাচাইয়ের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে পাঠাবেন। 
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, সিরাজগঞ্জের ক্ষিরিতলা বুরুজ সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন। সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও তিনি জানান।

ইত্তেফাক/বিএএফ