বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ২১:৫৫

বিজ্ঞানের আশীর্বাদে দিনদিন মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠছে আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক। আধুনিকতার এই ছোঁয়া পূর্বের থেকে মানুষের জীবনকে করে তুলেছে অনেক সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া এখন সর্বত্র। তবে বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা আমাদের সমাজের একটা শ্রেণির মানুষের জীবন ও জীবিকায় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনে আধুনিকতার এ ব্যবহার শুধু তাদের জীবিকাকেই হুমকির মুখে ঠেলে দেয়নি, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। যার প্রভাবে হারাতে বসেছে আমাদের পুরোনো ঐতিহ্য এবং পুরোনো রীতিনীতি। আধুনিকতার জোয়ারে হারিয়ে যেতে বসা তেমনই একটি ঐতিহ্য মৃিশল্প। মৃিশল্প আমাদের গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক, অথচ সেই মৃিশল্প আজ প্লাস্টিক, চীনামাটি, মেলামাইনসহ আরো অনেক আধুনিক নিত্য ব্যবহার্য্য সামগ্রীর কারণে হারিয়ে যাবার পথে। এক সময়ে আমাদের দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব থালা-বাসন-গ্লাস-পাতিল-কলস তৈরি হতো মাটি দিয়ে। এ বাসনগুলোতে থাকত সুনিপুণ হাতের ছোঁয়া আর ঐতিহ্যের অপূর্ব মিশেল; কিন্তু মানুষ সব সময় জীবনকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময়, আর শৌখিনতার চাদরে মোড়াতে চায়। সে কারণেই মৃিশল্প অর্থাত্ মাটির তৈরি বাসনকোসনকে দূরে রেখে আপন করে নিয়েছে রংবেরঙের বিদেশি পণ্য। পণ্যগুলো জায়গা করে নিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে। ফলে বাজারে চাহিদা কমেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রগুলোর, অন্যদিকে বাজার দখল করে নিয়েছে চীনামাটি, কাচ ও মেলামাইনের তৈরি দ্রব্যসামগ্রী। আর এসব কারণেই বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প।

এক সময় গ্রামীণ জনপদের মানুষ মাটির থালাতে ভাত খেত, মাটির হাঁড়িতে রান্নাবান্না করত। মাটির তৈরি এসব জিনিসপত্রই ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। বর্তমান প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মাটির তৈরি সেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসের জায়গা দখল করে নিয়েছে মেলামাইন, চীনামাটিসহ নানারকমের বাহারি পণ্য। মাটির তৈরি মনকাড়া সে পণ্যগুলো এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাহিদা ও জোগান না থাকায় গ্রাম-বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় আকর্ষণীয় আসবাবপত্র। অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ছুটছেন। তবে শত অভাব অনটনের মধ্যেও দেশের অল্প কয়েকটি জেলায় হাতেগোনা কিছু পরিবার আজও পৈতৃক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, করোনার প্রভাবে মৃিশল্পের বাজার আরো সংকুচিত হয়ে গেছে। মূলধন হারাতে বসেছে গ্রামীণ কারিগররা। তবে এটা সত্য যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের দ্রব্যসামগ্রী হিসেবে মৃিশল্পের চাহিদা কমলেও সুন্দর সুন্দর টেরাকোটা শৌখিনতার জায়গাটা ধরে রেখেছিল এই আধুনিক যুগেও; কিন্তু করোনার প্রভাবে সেই চিত্রও বদলে গেছে। বিপাকে পড়েছেন মৃিশল্পীরা।

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মৃিশল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এ শিল্প যাতে আমাদের মধ্যে প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে বেঁচে থাকে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। তাহলেই গ্রাম-বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য মৃিশল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই মৃিশল্প সম্পর্কে জানতে পারবে, তারাও  মাটির কাঁচা গন্ধ পাবে, মৃিশল্পের ঐতিহ্যকে ধরে রাখবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়