সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননা সংক্রান্ত পোস্ট দেখেই রংপুরের পীরগঞ্জে মানুষ জড়ো হয়ে মাঝিপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করে। আর ফেসবুকে অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ঐ পোস্ট দিয়েছিলেন সৈকত মণ্ডল নামের এক তরুণ (ছাত্রলীগ নেতা)। তার নেতৃত্বেই এই হামলা হয়। হামলার আগে সৈকতের নির্দেশে রবিউল নামে আরেক জন পাশের মসজিদের মাইক থেকে লোকজনকে জড়ো হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। সৈকত মণ্ডল (২৪) ও তার সহযোগী রবিউল ইসলামকে (৩৬) শুক্রবার গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে র্যাব।
ইত্তেফাক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সৈকত মন্ডল কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের দর্শন বিভাগের সহসভাপতি ছিলেন। হামলার পরের দিন ১৮ অক্টোবর শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠনের কলেজ শাখা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এদিকে কুমিল্লা নগরীর নানুয়াদীঘির উত্তর পাড়ের অস্থায়ী পূজামণ্ডপে গত ১৩ অক্টোবর পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন ইকবাল হোসেনসহ গ্রেফতার চার জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
পীরগঞ্জে হামলা বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ফেসবুকে সৈকত গত ১৭ অক্টোবর রাতে পোস্ট দিয়েছিলেন—‘এ মুহূর্তে গ্রাম পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ, হিন্দুদের আক্রমণে এক মুসলিমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ দুর্গাপূজার মধ্যে কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পর সেই রাতেই পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ২৩টি বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, সৈকত উসকানি ছড়ানোর পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন। পোস্ট দেওয়ার পর লোকজন জড়ো হলে একটি উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে সৈকত লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। পরে সৈকত ও রবিউল আত্মগোপনে চলে যান। সৈকত স্থানীয় একটি কলেজের স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থী, রবিউল স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন।
রংপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, কারমাইকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা জানান, পীরগঞ্জে হামলার ‘মূলহোতা’ সৈকত মন্ডল আগে থেকেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। আগেও তার ফেসবুক থেকে ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়ায় সহপাঠীরা ক্ষুব্ধ ছিল। ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান সিজার বলেন, মহানগর ছাত্রলীগের পরামর্শে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এদিকে রংপুরের পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার পর মাঝিপাড়ার বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এমপি। গতকাল দুপুরে উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত বড়করিমপুর মাঝিপাড়া গ্রাম পরিদর্শনের পর বটেরহাট আরডিএস দাখিল মাদ্রাসা মাঠে জেলা প্রশাসন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬৫ লাখ টাকাসহ খাদ্য ও বস্ত্র সহযোগিতা করা হয়েছে। ১৪টি ঘর নির্মাণ এবং ৪০টি ঘর মেরামত করা হয়েছে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, দুপুরে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কড়া পাহারায় মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ইকবালসহ চার আসামিকে কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিয়ে গেলে বিচারক বেগম মিথিলা জাহান উর্মি তাদের রিমান্ডের আদেশ দেন। এছাড়া রিমান্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- পুলিশকে ৯৯৯-এ ফোন করা নগরীর বজ্রপুর এলাকার রেজাউল ইসলাম ওরফে ইকরাম, দারোগা বাড়ি মাজার মসজিদের সহকারী খাদেম মো. ফয়সাল ও জেলার বরুড়া উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের হুমায়ুন কবির।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত শুক্রবার দুপুরে ইকবাল হোসেনকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় আনার পর ঢাকা থেকে আসা উচ্চ পর্যায়ের যৌথ তদন্ত টিম তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় সে দারোগা বাড়ি মসজিদ থেকে পবিত্র কোরআন নিয়ে ঐ মণ্ডপে রেখেছিল বলে সে স্বীকার করে। তবে নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের বিষয়ে মুখ খুলছে না, সে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছে।
জানা যায়, ঘটনার দিন কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই হারুন অর-রশীদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা ও অবমাননার অপরাধে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় যে মামলাটি দায়ের করেছিলেন, ইকবালসহ অন্য তিন জনকে এই মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ইকবাল ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে, এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হবে। চার জনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে।
