তালেব রানা
বিশ্বে প্রভাব বজায় রাখতে নিত্যনতুন অস্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টায় রয়েছে ক্ষমতাধর দেশগুলো। এ কারণে সামরিক ক্ষমতায় একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিককালে কয়েকটি দেশের ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সেই প্রতিযোগিতারই ইঙ্গিত। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, এমনকি উত্তর কোরিয়া নতুন এই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে! এই দেশগুলো গত এক মাসের মধ্যে তাদের ‘হাইপারসনিক’ অর্থাত্ শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত গতিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। যা নিয়ে বিশ্বে নতুন করে উত্তেজনা একই সঙ্গে আশঙ্কার তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের যে প্রতিযোগিতা ছিল তার একটি তাত্পর্যপূর্ণ পর্ব এখন চলছে।
ক্ষমতাধর দেশগুলো এখন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পেতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যা তাদের সামরিক শক্তিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাবে। কেন দেশগুলো এই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পেতে উদ্গ্রীব? মূলত এই ক্ষেপণাস্ত্রের গতি হবে শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। যা শক্তিশালী রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হবে। এই হাইপারসনিক মিসাইল লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানার আগে চিহ্নিত করা বা মাঝপথে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া খুব কঠিন।
বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, শব্দের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ১২৫ ফুটের মতো। অনেক সামরিক জেট বিমান বা অধুনাবিলুপ্ত কনকর্ডের মতো যাত্রীবাহী বিমানও এর চেয়ে বেশি দ্রুত অর্থাত্ ‘সুপারসনিক’ গতিতে উড়তে পারে। কিন্তু একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুটতে পারে শব্দের চেয়ে পাঁচ থেকে ৯ গুণ বেশি গতিতে।
বর্তমানে বিশ্বে অন্তত আটটি দেশ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী হতে কেমন প্রতিযোগিতা চলছে, তা এসব দেশের প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায়।
সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক রিপোর্টে বলা হয়, গত আগস্টে চীন শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে। যদিও চীনের দাবি এটা ছিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি মহাকাশ যান, ক্ষেপণাস্ত্র নয়। তবে তাতে আশ্বস্ত হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। চীন ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে কতটা উন্নতি করেছে এবং এর পরিণাম কী হবে তা নিয়ে পেন্টাগণের কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
গত অক্টোবরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, রাশিয়া তাদের একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ব্যারেন্টস সি-তে সাবমেরিন থেকে জিরকন নামের দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষা চালানো হয়। শব্দের চেয়ে ৯ গুণ দ্রুতগতিতে উড়ে গিয়ে ১ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এই জিরকন। শুধু এই জিরকনই নয়, আরো কয়েক ধরনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে রাশিয়া।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র রেথিওন নামে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। এটি ছিল শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুত গতিসম্পন্ন। যদিও গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, হাইপারসনিক অস্ত্র নির্মাণে তাদের সর্বশেষ পরীক্ষা সফল হয়নি। পেন্টাগণের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাইপারসনিক গতি পাওয়ার জন্য রকেটে ব্যবহূত একটি যন্ত্র বিফল হয়েছে। রকেটটি ব্যর্থ হওয়ায় পেন্টাগণ হাইপারসনিক গ্লাইড বডির পরীক্ষা করতে পারেনি। যা এমন অস্ত্র তৈরির জন্য মূল উপাদান। কর্মকর্তারা পরীক্ষাটির পর্যালোচনা করছেন। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া গত মাসে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। কিছুদিন আগেই তারা একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করেছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সূত্রগুলো দাবি করে। যদিও ঐ পরীক্ষা সফল হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র আকস্মিক আক্রমণের জন্য এগুলো হবে খুবই উপযোগী। প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় রকেটের মতো। ফলে উেক্ষপণ করার পর এর ট্রাজেক্টরি বা গতিপথ কী হবে তা মোটামুটি অনুমান করা যায়। লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই প্রতিপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা দিয়ে এটিকে ধ্বংসের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তি একেবারেই ভিন্ন।
এটি উেক্ষপণের পর খুব দ্রুত ওপরে উঠে আবার নেমে এসে আনুভূমিকভাবে বায়ুমণ্ডলের মধ্যেই চলতে থাকে, গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে। এর অর্থ এটি কোনদিকে যাবে তা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাই তা মাঝপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। তাই এ মুহূর্তে বিশ্বে প্রতিযোগিতাটা হচ্ছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে। এতদিন ধরে বিভিন্ন দেশের হাতে যেসব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, সেগুলো অনেকটা প্রাচীন হয়ে যাচ্ছে। এই জায়গা পূরণ করতেই নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে কার আগে কে এই সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী হবে।
