সৈকত-রবিউলসহ ছয় জনের আদালতে স্বীকারোক্তি

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৭

রংপুরের পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মন্ডল ও মসজিদের ইমাম রবিউল ইসলাম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া নোয়াখালীর চৌমুহনীতে মন্দির ভাঙচুরের মামলায় চার আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল রবিবার পৃথক আদালতে জবানবন্দি প্রদান শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দীঘির পাড়ের পূজামণ্ডপের ঘটনায় গ্রেফতার ইকবাল হোসেনের দেওয়া তথ্যে তিন জনের স্কেচ নিয়ে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা।

রংপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, পীরগঞ্জে হামলার ঘটনার অন্যতম ‘হোতা’ সৈকত ও রবিউলের বিরুদ্ধে গতকাল নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা (আইসিটি) আইনে মামলা করেছে র?্যাব। সন্ধ্যায় তারা রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দেলোয়ার হোসেনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এদিকে এ ঘটনায় আটক ৩৭ আসামিকে আদালতের নির্দেশে তিন দিনের রিমান্ডশেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আসামিরা কেউই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। আদালতের এসআই শহিদুল ইসলাম এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

রংপুর জেলা পুলিশের এএসপি কামরুজ্জামান বলেন, মাঝিপাড়ায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট চারটি মামলা হয়েছে। ৬৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সৈকত মন্ডল ও  ইমাম রবিউল ইসলামের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর রাতে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের বড়করিমপুর মাঝিপাড়া গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা।

এদিকে এ ঘটনায় কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের দর্শন বিভাগের সাবেক সহসভাপতি সৈকত মন্ডলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় কলেজ ছাত্রলীগ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি শফিউর রহমান স্বাধীন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আসিফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে ১৮ অক্টোবর সৈকতকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার চার আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যায় জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নবনীতা গুহের আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ১৫ অক্টোবরের এ ঘটনায় সিসি টিভি ফুটেজ দেখে শনিবার আট জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরা বেগমগঞ্জ ও চৌমুহনী পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।  এদের মধ্যে  রিপন আহাম্মেদ মাহীর (১৯), আরাফাত হোসেন রাজিব (১৯),  ইব্রাহিম খলিল রাজিব (২৪) ও আব্দুর রহিম সুজন (১৯) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এদিকে  আসামিদের জবানবন্দিতে নাম আসা আরো এক আসামি  মো. রাব্বিকে শনিবার দিবাগত রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আরো জানান, নোয়াখালী জেলার সাত উপজেলায় পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় ২৫টি মামলা হয়েছে। এতে ৭ হাজার ৯০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।  ১৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গত ১৩ অক্টোবর নগরীর নানুয়া দীঘির পাড়ের পূজামণ্ডপের ঘটনায় গ্রেফতার ইকবাল হোসেনের একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্যে রীতিমতো ঘুরপাক খাচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সে বলছে, তাকে (ইকবাল) দিয়ে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের সে চেনে না এবং নাম-পরিচয়ও জানে না। ইকবাল কার প্ররোচনায় পবিত্র কোরআন পূজাণ্ডপে রেখেছেন তা এখনো বলেননি। তবে ইকবাল তিন ব্যক্তির শারীরিক গঠন, মুখাবয়ব বা চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন, এর ওপর ভিত্তি করে স্কেচ তৈরি করে তাদের গ্রেফতারে তদন্তে সহায়তাকারী সংস্থাগুলো মাঠে কাজ করছে। এদিকে ঐ তিন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে নগরীর দারোগাবাড়ি মাজার ও আশপাশের এলাকার ৯ দিনের (৫-১৩ অক্টোবর) সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তা সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখে ইকবালের সঙ্গে মাজারে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের একটি তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

ইকবাল হোসেনের নিকট থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, ঘটনার ২০ দিন আগে থেকে সে (ইকবাল) দারোগাবাড়ি মাজারে অবস্থান করছিল। সেখানে তার সঙ্গে তিন ব্যক্তির পরিচয় হয়। তারা মাদকাসক্ত। একপর্যায়ে নেশার জন্য তাদের সঙ্গে মিশতে শুরু করে সে। ঐ ব্যক্তিরা তাকে গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের ব্যবস্থা করে দেয়। পূজা শুরু হলে তারা ইকবালকে মাজারের পাশে মন্দির থাকার কারণে ইসলাম ধর্মের অবমাননা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে তার (ইকবাল) পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে তাকে উত্তেজিত করতে থাকে। ঘটনার রাতে তারা একসঙ্গে মাজারের পাশে বসে গাঁজা সেবন করে। পরে তারা ইকবালকে পূজামণ্ডপে কোরান শরিফ রাখতে বলে। জিজ্ঞাসাবাদে অন্যরাও বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।