বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ

সোনারগাঁওয়ে যুবলীগ কর্মী হত্যার আসামি, কেরানীগঞ্জে ভূমিদস্যু পেলেন নৌকা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২২:৩৭

তৃতীয় ধাপের আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন বিতর্কিতরা। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় এক ভূমিদস্যু, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে যুবলীগ কর্মী হত্যা মামলার আসামি এবং রাজবাড়ীতে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি পেয়েছেন নৌকার মনোনয়ন। এদিকে বিতর্কিতরা মনোনয়ন পাওয়ায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিতর্কিতরা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে জেলা ও কেন্দ্রের এক শ্রেণির নেতাকে ম্যানেজ করছেন। এ কারণে মনোনয়ন বোর্ডের কাছে সঠিক সত্য যাচ্ছে না। কোনো কোনো ইউপিতে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের একক প্রার্থী হিসেবে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন রেজাউল করিম। ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতিও ছিলেন তিনি। দুই বারের ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিকে বাদ দিয়ে একসময়ের বিএনপি নেতা রেজাউল করিমকে মনোনয়ন দেওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা হতাশ।

ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার শাক্তা ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ‘মধুসিটি’ হাউজিংয়ের অন্যতম মালিক হাবিবের বিরুদ্ধে এলাকায় অন্যের জমি, খাসজমি ও খাল-নদী দখলের বহু অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত ও নাগরিক সমাজ অনেক বার মানববন্ধন ও বিক্ষোভও করেছেন। যার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। কেরানীগঞ্জ মডেল থানার জিনজিরা ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন মো. সালাউদ্দিন। জানা গেছে, এখানে নৌকার দাবিদার ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান সাকুর হোসেন সাকু। উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাকু বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে নির্যাতিত এবং বহু মামলায় আসামি। সাকুর পরিবর্তে সালাউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কালিন্দী ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া ফজলুল হক আগেও একবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এলাকায় প্রচারণা রয়েছে, রহস্যজনক কারণে তখন তিনি নৌকা ফেলে আত্মগোপনে চলে যান। ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান হাজী মোজাম্মেল হোসেন মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা হতাশ।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন মো. নাছির উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার এবং নদীর বালু উত্তোলনের অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে।  মেঘনা নদীর বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিতে ২০১৫ সালে চর হোগলা গ্রামে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবলীগ কর্মী জামাল হোসেন। নাছির উদ্দিন সেই মামলার আসামি ছিলেন। এছাড়া সোনারগাঁওয়ের বারদী ইউনিয়নে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন মাহাবুব রহমান। তার পরিবার জড়িত ছিল বিএনপির রাজনীতিতে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দুই বারের ইউপি চেয়ারম্যান জহিরুল হককে মনোনয়ন না দেওয়ায় বিস্মিত স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

 লালমনিরহাটে ভূমিদস্যুকে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি

লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ভূমিদস্যু, হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, বিএনপি থেকে আগত ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান জেলার তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতারা। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রাজাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. পরেশ চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচনে জেলা থেকে প্রার্থীর নাম প্রেরণে অনিয়ম করা হয়েছে। দলীয় আলোচনা ও তৃণমূলের ইচ্ছানুযায়ী কেন্দ্রে যোগ্য ও পরীক্ষিত প্রার্থীর নাম প্রেরণের কথা ছিল। কিন্তু অনিয়ম করে মোফাজ্জল হোসেন মোফার নাম কেন্দ্রে পাঠান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান। এক্ষেত্রে অনৈতিক বাণিজ্য করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

রায়েদ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বদলের দাবি

গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শফিকুল হাকিম মোল্লাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, সাম্প্রদায়িক ও আওয়ামী আদর্শবিরোধী আখ্যায়িত করে তার দলীয় মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ইউনিয়নের সাবেক  চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাইয়ের কন্যা আমিনা খাতুন (মুনমুন)। যুব মহিলা লীগ গাজীপুর জেলা শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং কাপাসিয়া থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনা শনিবার রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান। আমিনা খাতুন (মুনমুন)ও এই ইউপিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

হোমনায় তৃণমূলের প্রস্তাবে অনিয়মের অভিযোগ

দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিপুল পরিমান আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কুমিল্লার হোমনা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। এ ব্যাপারে দলীয় সভানেত্রী বরাবর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত ঐ অভিযোগে বলা হয়, আসন্ন তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে না। এলাকার এক শ্রেণির নেতা বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে দলীয় গঠনতন্ত্র অমান্য করে বিতর্কিত ও হাইব্রিডদের মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রে তালিকা পাঠাচ্ছেন। এতে করে দলের বিশ্বস্ত ও ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে দলীয় কোন্দল। এই অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও আস্থাহীনতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রার্থী বছাইয়ে জরুরি ভিত্তিতে সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।