ঋতু : অনুভবের ঋতু হেমন্ত

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৫৩

দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু

 

জীবনানন্দ দাশ ভোরের কাক হয়ে ফিরে আসতে চেয়েছেন এই কার্তিকের নবান্নের দেশে। কেবল কবি কেন যে কেউ মুগ্ধ হবেন কার্তিক-অগ্রহায়ণের ভোরের অপরূপ সৌন্দর্যে। কবি লিখেছেন, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব...

নিজের রূপে আর গুণে সমৃদ্ধ বাংলা জননী। ছয়টি ঋতু দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে নিজেকে। ঋতুচক্রে ঘটেছে হেমন্তের আগমন। কৃষকের মুখে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি নিয়ে প্রকৃতিতে আসে হেমন্ত। নুয়ে পড়া ধানের শিষে হালকা শিশিরের পরশ বুলিয়ে জানান দেয় হেমন্ত এসে গেছে।

মাঠজুড়ে সোনালি ফসল। তাই তো প্রকৃতির স্বর্ণঋতু হেমন্ত! হেমন্তের সকালের সোনা রোদ অপরূপ এক সৌন্দর্য। কার্তিকের ভোরে ধানের ডগায় মুক্তার মতো শিশিরকণা মন ছুঁয়ে যায়। গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতিতে হেমন্তকে ঘিরে উত্সবের আমেজ চিরকালীন রূপ। কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে সোনার ফসল ঘরে তুলতে। গরু দিয়ে ধান মাড়াইয়ের দৃশ্যও চোখে পড়ে। তারপরও সোনালি রঙের ফসলকে নিয়ে কৃষক পরিবারগুলোতে শুরু হয় আনন্দ উত্সব। কিষানিরা ব্যস্ত থাকে ধান মাড়াই, রোদে শুকানোর কাজে। আর তারপরই ঘরে ঘরে শুরু হয় বাংলার ঐতিহ্য ‘নবান্ন উত্সব’। নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় উত্সবের। অগ্রহায়ণে নতুন ধানের চাল দিয়ে রান্না করা হয় ফিরনি-পায়েস। কোনো কোনো অঞ্চলে বানানো হয় বাহারি পিঠা। হেমন্তের প্রধান ফল নারিকেল। নতুন চালের গুঁড়ার সঙ্গে নারিকেল মিশিয়ে নানা বাহারের পিঠা সারা রাত জেগে তৈরি করেন গৃহিণীরা। নবান্নকে ঘিরে বসে গ্রামীণ মেলা। লাঠিখেলা, বাউলগান, নাগরদোলা, বাঁশি, শখের হাঁড়ি, চুড়ি, খৈ, মোয়া, পুতুল নাচ, বায়স্কোপ সব মেলে এখানে। সঙ্গে থাকে দেশীয় নৃত্য, গান-বাজনাসহ আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নবান্ন উত্সবে নিমন্ত্রণ জানানো হয় নতুন জামাইকে। মেয়েকেও বাপের বাড়িতে আনা হয় ‘নাইওর’। এর কিছু পরই আসে অতিথি পাখিরা। হেমন্তের শেষে এ দেশের প্রকৃতিকে ভালোবেসে তারা আসে। প্রকৃতিও তখন মুখর হয়ে ওঠে অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে।

সবাইকে এক সুতোয় বাঁধাই যেন হেমন্তের কাজ, হোক তা মানুষ কিংবা প্রকৃতি। আর তাই তো হেমন্তকে বলা হয় ‘ঋতুকন্যা’। হেমন্তকে ছোঁয়া যায় না, ধরা যায় না। প্রকৃতিতে তার প্রখরতা বিরাজ করে না। তাই হেমন্তকে উপলব্ধি করতে হয়, অনুভব করতে হয়। কিছুটা ধূসর আর অস্পষ্ট ঋতু। গ্রীষ্মের মতো খরতাপ নেই, বর্ষার বৃষ্টির মুখরতা নেই, শীতের তীব্রতার উপস্থিতিও নেই এখানে।

হেমন্তকে তাই খুঁজে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয়।