সৃষ্টির শুরু হইতে এখন অবধি পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটিয়াছে শত সহস্রবার। ইহা প্রকৃতির একটি নিরন্তর খেলা। বিজ্ঞানীরা ধারণা করিয়া থাকেন, এখন অবধি পাঁচ বার পৃথিবীতে প্রাণের মহাবিলুপ্তি ঘটিয়াছে। ধর্মগ্রন্থে আমরা নুহ নবির (আ.) নৌকার কথা জানি, যখন পৃথিবীতে মহাপ্লাবন হইয়াছিল। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্যই একেক সময় প্রাণের মহাবিলুপ্তি ও মহাপ্লাবনের মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়াছিল। কিন্তু প্রায় তিন শত বত্সর পূর্বে শুরু হওয়া শিল্পায়নের পর হইতে এখন অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়াছে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর স্বাভাবিক ঘটনা হইলেও উহা যত আস্তে ধীরে হইবার কথা, বৈশ্বিক শিল্পায়নের কারণে তাহা হইতেছে অতি দ্রুত। আর ইহাই মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হইয়া উঠিতেছে বলিয়া মনে করেন বিশ্বের বেশির ভাগ জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানী। একটি উপায় বাহির করিতে চলতি মাসের শেষে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শুরু হইতে যাইতেছে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন (কপ-২৬)। ইতিপূর্বে জাতিসংঘ সতর্ক করিয়া বলিয়াছে, কপ-২৬ ব্যর্থ হইলে বিশ্বব্যাপী চরম সংঘাত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। কপ-২৬-এর অন্যতম লক্ষ্য হইল—বিশ্বের কার্বন নিঃসারণের হার ২০১০ সালের তুলনায় ৪৫ শতাংশ হ্রাস করা। একই সঙ্গে বিশ্বের তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাইয়া আনিবার বিষয়ে ২০৩০ সালের সময়সীমা বাধিয়া দেওয়া।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই দুইটিই বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন লক্ষ্যমাত্রা। যাহারা অনেক আগে হইতেই শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হইয়াছে, তাহারা এতকাল নির্বিচারে কার্বন নিঃসারণ করিয়াছে, কিন্তু যাহারা এখন শিল্প-কলকারখানার মাধ্যমে তাহাদের অর্থনীতিকে উন্নতির কাতারে লইয়া যাইতে শুরু করিয়াছে, তাহারা কেন এখন এত রকম শক্ত শক্ত শর্ত মানিবে? এই প্রশ্ন উঠতি শিল্পোদ্যোগী দেশগুলি হইতে আসিতেছে। তাহার পরও অনেকে আশাবাদী যে, আসন্ন সম্মেলনে বিশ্বের ১২০ জনের বেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং প্রায় ৩০ হাজার জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ভালো সমাধান বিশ্ববাসী দেখিতে পাইবে। ক্লাইমেট চেঞ্জ-বিষয়ক এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি প্যাট্রিসিয়া এসপিনোসা ইতিপূর্বে সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন যে, এই সম্মেলনের ব্যর্থতা ভয়াবহ পরিণতি ডাকিয়া আনিতে পারে। ভাঙিয়া পড়িতে পারে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন ও খাদ্যসংকট বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির করিতে পারে। বহু বত্সর ধরিয়া এই বিশ্ব যেই স্থিতিশীল রাষ্ট্রকাঠামো গড়িয়া তুলিয়াছে এবং একধরনের বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ধরিয়া রাখিয়াছে, সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট হইতে পারে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতদের স্রোত এই শৃঙ্খলাকে হুমকিতে ফেলিবে। একই সঙ্গে দেশে দেশে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও অস্থিতিশীলতাও বৃদ্ধি পাইতে পারে। অর্থাত্ সার্বিকভাবে আধুনিক বিশ্বের তৈরি রাষ্ট্রকাঠামো নষ্ট করিয়া দিতে পারে। ইতিমধ্যে প্যারিস চুক্তি সইয়ের পাঁচ বত্সর পার হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এখনো চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নাই। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি হইতে এক দফা নাম প্রত্যাহারের পর পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে। বস্তুত, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সইয়ের পর বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই পালটাইয়া গিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও আগের তুলনায় অনেক বেশি শীতল। সুতরাং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কপ-২৬ সম্মেলন অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হইবে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেকে।
যদিও অনেক বিজ্ঞানী বলিয়া থাকেন, প্রাক-শিল্পায়নের যুগ হইতে এখন অবধি প্রায় তিন শত বত্সরের হিসাব দিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট সমীকরণ টানিবার সুযোগ নাই। কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। কিন্তু জলবায়ুর যে পরিবর্তন ঘটিতেছে এবং তাহা একটু দ্রুতই ঘটিতেছে—এই ব্যাপারে কাহারো দ্বিমত নাই। আমাদের একটাই গ্রহ। প্ল্যান-এ সফল না হইলে হয়তো প্ল্যান-বি লইয়া ভাবা যায়, কিন্তু আমাদের তো একটাই প্ল্যানেট। সুতরাং প্ল্যানেট-বি বলিয়া কিছু নাই বিধায় পৃথিবীকে রক্ষা ব্যতীত আমাদের সামনে বিকল্পও কিছু নাই।
