উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অর্ধেক চিকিত্সক অনুপস্থিত

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৪

সারাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বেহাল দশা বিরাজ করছে। এ সব হাসপাতালে অর্ধেক চিকিত্সক অনুপস্থিত থাকেন। প্রেষণ, সংযুক্তি ও বিনা অনুমতিতে তারা অনুপস্থিত থাকছেন। আবার হাসপাতালের পদও শূন্য আছে অর্ধেক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বারবার হুঁশিয়ারির পরও যেন দেখার কেউই নেই। মনিটরিংয়ের নামে চলছে ধাপ্পাবাজি। সুস্থ মনিটরিংয়ের অভাবেই এমন বেহাল দশা তৃণমূলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার, সার্জন, গাইনি ডাক্তার ও কনসালটেন্ট না থাকায় অনেক হাসপাতালে অপারেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করে ইত্তেফাককে জানান, অ্যানেসথেসিয়া সংকট প্রকট। আবার অনেক হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া থাকলেও কনসালটেন্ট থাকে না, আবার গাইনি ডাক্তার পাওয়া যায় না। এ কারণে অপারেশন কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। এতে গ্রামাঞ্চলের রোগীরা অপারেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অপারেশন ও নিরাপদ ডেলিভারির জন্য ঝুঁকি নিয়ে রাজধানী কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে তাদের প্রতিদিনই ছুটতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে সরেজমিনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা চিকিত্সকের অনুপস্থিতিসহ বিস্তারিত তথ্য জানান। কর্মকর্তারা বলেন, ১১টি নতুন মেডিক্যাল কলেজসহ ৩৪টি হাসপাতালে দীর্ঘদিন চাহিদা অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এ ছাড়া যে পদ আছে সেই পদে চিকিত্সকও দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে নতুন ১১টি মেডিক্যাল কলেজে কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। অন্য জায়গা থেকে প্রেষণে ডাক্তার এনে মেডিক্যাল কলেজ চালানো হচ্ছে। ২৩টি জেলা সদর হাসপাতাল ১০০ বেড থেকে ২৫০ বেডে করা হলেও জনবল বাড়ানো হয়নি। ১০০ বেডের হাসপাতালের জনবল দিয়েই চলছে ২৫০ বেডের হাসপাতাল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ৮০০ বেড থেকে ২৬শ বেডের করা হয়েছে। কিন্তু জনবল বাড়ানো হয়নি। ৮০০ বেডের জনবল দিয়ে বছরের পর বছর চলছে ২৬শ বেডের এ হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা। প্রতিদিন রোগী চিকিত্সাধীন থাকে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার। বহিঃবিভাগে রোগী আসে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার। জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘটনা-দুর্ঘটনা, আহতসহ সংকটাপন্ন কয়েক হাজার রোগীর এখনো ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সা সেবা দেওয়া হয়। এ বিশাল চিকিত্সা সেবা সীমিত সংখ্যক চিকিত্সক-নার্সরা দিতে গিয়ে নিদারুণ সমস্যার শিকার হন। পুরনো ৮টি মেডিক্যাল কলেজের চিত্র প্রায় একই।

এ দিকে উপজেলা পর্যায়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণও জানিয়েছেন একাধিক চিকিত্সক। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সকদের আবাসিক সংকট প্রকট। যেখানে রাখা হয় সেখানে অনেকটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়। আবাসন ভাঙ্গাচোরা, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নারী চিকিত্সকরা থাকতে পারবেন কিনা সেটা বড়ই প্রশ্ন। মেইনটেন্যান্সে বরাদ্দ কম। যা বরাদ্দ থাকে সেটাও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। এ সব অনেক কারণে চিকিত্সকরা নানা অজুহাতে কর্মস্থলে থাকতে চান না। এ বিষয়টির যতদিন সুরাহা হবে না, ততদিন চিকিত্সকদের কর্মস্থলে উপস্থিতির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। কয়েকজন চিকিত্সক বলেন, ‘অবকাঠামো বাড়লেও জনবল বাড়ছে না দীর্ঘদিন ধরে। আমরাও তো মানুষ।’ জানা গেছে, কোনো কোনো উপজেলা একজন চিকিত্সক দিয়ে চলছে। আবার কোনো উপজেলায় বাই রোটেশনে চিকিত্সকরা দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলায় পদায়ন করা হলেও উচ্চপর্যায়ে তদবির করে অনেকে প্রেষণে অথবা সংযুক্তি নিয়ে পছন্দমতো কর্মস্থলে চলে যান। আবার অনেকে অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ পরিস্থিতিতে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে উপজেলায় চিকিত্সক অনুপস্থিতির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপজেলায় থাকতে না চাইলে তিনি চিকিত্সকদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ারও আহ্বান জানান; কিন্তু এতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

ইত্তেফাকের উপজেলা প্রতিনিধিরা সরেজমিন গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সকদের অনুপস্থিতির চিত্র পেয়েছেন। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাসহ ৬ জন ডাক্তার আছেন। একজন মেডিক্যাল অফিসার আছেন। এ হাসপাতালে পদ আছে ২১টি। কনসালট্যান্ট, সার্জারি ও গাইনি পদ ফাঁকা। দৈনিক ৪০/৫০ জন রোগী চিকিত্সাধীন থাকে। বহিঃবিভাগে প্রতিদিন আসে দুই শতাধিক রোগী। দেবীগঞ্জে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান জানান, ডাক্তার না দিলে কী করবো? যা আছে তাই দিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।

দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯টি পদ থাকলেও চিকিত্সক আছেন মাত্র ৪ জন। একজন আবার প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায়। মাত্র তিনজন ডাক্তার দিয়ে চলছে ৫০ বেডের এ হাসপাতাল। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ৫০ বেডের এই হাসপাতালে ২১টি পদ আছে। কিন্তু ডাক্তার আছেন মাত্র ৪ জন। ওটি থাকলেও কনসালট্যান্ট নেই। একজন আরএমও আছেন, লোকাল দিয়ে ছোটখাটো অপারেশন করা হয়। গাইনি ও  অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার রংপুর মেডিক্যাল কলেজে প্রেষণে গিয়ে সেখানে চিকিত্সা সেবা দেন। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ জন চিকিত্সকের পদ আছে। কিন্তু অর্ধেকের বেশি নানা অজুহাতে অনুপস্থিত থাকেন। ডেন্টাল, সার্জন ও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার পদ দীর্ঘদিন শূন্য। শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. আরশাদুল্লাহ বলেন, সাব সেন্টার দিয়ে ৭ জন ডাক্তার দীর্ঘদিন ধরে প্রেষণে রয়েছেন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯ জন চিকিত্সকের পদ আছে। ৭ জন প্রেষণে আছেন। ৫ জন চিকিত্সক কর্মস্থলে থাকেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেই। অনেক ডাক্তার দেরি করে আসে কর্মস্থলে। বিশেষ করে রাতের বেলায় সমস্যা হয়। পূর্ণাঙ্গ অপারেশন থিয়েটার থাকলেও অপারেশন হয় না। কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মীর মোশাররফ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নেই। এ কারণে অপারেশন বন্ধ। টুকটাক অপারেশন লোকাল দিয়ে করানো হয়। কুমিল্লার চানদিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ বেডের হাসপাতাল। ২২ জন ডাক্তারের থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন।  চানদিনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. নাসিমা আক্তার জানান, ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে এ হাসপাতালটি। কিন্তু এখনো প্রশাসনিক অনুমোদন পাইনি, প্রয়োজনীয় জনবলেরও অভাব রয়েছে। তাই ৩১ শয্যার সেবা দেওয়া হচ্ছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯টি পদ থাকলেও চিকিত্সক আছেন মাত্র ৭ জন। এ ছাড়া, ১২টি পদ শূন্য। গাইনি কনসালট্যান্ট ও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার পদ দুটি ৪ বছর ধরে শূন্য। এ উপজেলার আওতাধীন ১০টি ইউনিয়ন সাব সেন্টারের প্রতিটিতে একজন করে মেডিক্যাল অফিসার থাকার কথা। কিন্তু এক বছর ধরে কোনোটিতে চিকিত্সক নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, চিকিত্সকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে ওই দিনের বেতন কর্তন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলায় ৬ জন করে মেডিক্যাল অফিসার নিয়োগ দেওয়া হবে। ৩ জন বহিঃবিভাগ ও ৩ জন আন্তঃবিভাগে দায়িত্ব পালন করবেন। গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে বলে মহাপরিচালক জানান। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী জানান, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে ২৫ হাজার ৫শ পদ আছে। ২২ হাজার ৫শ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিন হাজার পদ খালি আছে। তিনি বলেন, চাহিদার প্রেক্ষিতে আরো দ্বিগুণ পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কারণ এখন অনেক রোগী বাড়ছে।