মানুষ নীরবতাকে ভালোবাসে বলেই ফুল ভালোবাসে। ফুলের সৌন্দর্য হলো নীরবতার মতো সুন্দর।
ব্রহ্মকমল! নামের মধ্যেই কেমন মন্দ্র গভীর রহস্যময়তা। নাম শোনার পর থেকেই মাথায় ঘুরছে ব্রহ্মকমলের নাম। গুগল ঘেঁটে জানার চেষ্টা করছি, ছবি দেখছি অপলক দৃষ্টিতে। ফুলের রাজ্যে কমল বা পদ্ম বিশেষ আদরণীয়। পদ্ম মানেই আমরা জানি দুর্গাপূজার অপরিহার্য নৈবেদ্য। লাল, গোলাপি, সাদা—এই তিন রকমের জলকমলই পদ্মফুলের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে জনম জনম ধরে। কুমিল্লার বুড়িচংয়ের দক্ষিণগ্রামের পদ্ম বিলে প্রথম দেখা মেলে হরিদ্রাভ গোমতী পদ্মের, যা পৃথিবীর আর কোথাও কেউ দেখেনি আগে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে, চলছে গবেষণা। এই হলুদাভ গোমতী পদ্ম বাংলাদেশকে একদিন পরিচয় করিয়ে দেবে বিশ্বদরবারে এমনই আশাবাদ উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের। আর নীল পদ্মকে চির রহস্যের চাদরে ঢেকে দিয়েছেন কবি-সাহিত্যিকগণ। সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায় যেমন তাঁর প্রেমিকার জন্য বিশ্বসংসার তন্নতন্ন করে খুঁজে এনেছিলেন ১০৮টি নীল পদ্ম। কিন্তু মন ভোলাতে পারেননি প্রেমিকার, কেউ কথা রাখেনি! হূদকমলের খোঁজ না করে নীলকমলের খোঁজ করে ভবসংসারে বৃথাই বাড়ে হয়রানি। আমার ধারণা, কবি-সাহিত্যিকগণ নীলকমল বলতে হূদকমলকেই বুঝিয়েছেন, যার রহস্যের কূল-কিনারা করতে এক জনম যথেষ্ট নয়। তবে কোনো প্রেমিক যদি ১০৮টি নীল শালুক ফুল তুলে এনে দেন প্রেমিকার করকমলে তাহলে তার মনোবাঞ্ছা পূরণ হলেও হতে পারে।
গোধূলির মতো সুন্দর নীল শালুক ফুল। নীল শাপলা নামেও পরিচিত নীল শালুক। নীল শাপলাকে ‘নীল পদ্ম’ বলে ভুল করলে ক্ষতি কী! শুধু কি জলপদ্ম! প্রথম যেদিন স্থলপদ্ম দেখি সেদিন আমি যা দেখেছি তা কী করে বলে বোঝাবো, আমি কেবল বলতে পারি ‘আমি তারে দেখিলাম’! পাবনার চাটমোহর উপজেলায় একদিন গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম সন্ধ্যার কিছু আগে। অস্তগামী সূর্যের বিচ্ছুরিত তির্যক আলোয় দেখি এক গৃহস্তের দুয়ারে অচেনা ফুলের গাছ ঝলমল করছে। গাছটি লম্বায় ঘরের দুয়ার অতিক্রম করেছে। আমার ভ্রমণসঙ্গী নীলা আপা জানাল ওর নাম স্থলপদ্ম। শেষ বিকেলের আলোয় দেখা স্থলপদ্মের রূপ এককথায় নয়নহরা।
শুধু জলে নয় স্থলেও জন্মে হরেক রকম পদ্ম! যেমন পাথরের পদ্ম বা হিমালয় পদ্ম বা ব্রহ্মকমল। নামে মিল থাকলেও স্থলপদ্মের সঙ্গে পরিবার বা গোত্রগত কোনো মিল নেই জলপদ্মের। স্থলপদ্ম মূলত জবাগোত্রীয় উদ্ভিদ।
ব্রহ্মকমল আবার কন বা কামপু নামেও পরিচিত। কথিত আছে, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা একটি বিশাল সাদা পদ্ম থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ব্রহ্মাকে জন্ম দিয়েছে বলেই এর নাম ব্রহ্মকমল। ব্রহ্মকমল হলো দেবতাদের প্রিয় ফুল, এটি দিব্যফুল। মে-জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ফোটে ব্রহ্মকমল। সন্ধ্যা ৭টা-৮টা থেকে এর ফোটা শুরু হয়, রাত ১১টা-১২টার মধ্যে ফোটা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। দিনের আলো ফোটার আগেই নিস্তেজ হয়ে যায়। এই ফুল ফোটা দেখলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে শ্রুতি আছে। ব্রহ্মকমলকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। হিমালয় পর্বতের ৪৫০০ মিটার ওপরেও ব্রহ্মকমল ফুটতে দেখা যায়। হিমালয়ের পাথুরে ঢালে জন্মায় ব্রহ্মকমল। এটি উত্তরখণ্ডের স্টেট (রাজ্য) ফুল। ভেষজগুণের জন্য ব্যাপক নিধনের শিকার ব্রহ্মকমল, ফলে এটি এখন বিপন্ন তালিকাভুক্ত।
ব্রহ্মকমল মিষ্টি সুবাসযুক্ত ফুল।
সুপ্তি জামান
