মহাকাশের রহস্যের শেষ নেই। মহাকাশে কোটি কোটি গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ আছে। আমাদের সৌরজগত্ এগুলোর একটি। আমরা এগুলোর কতটুকু জানি! আমাদের সৌরজগতে গ্রহ, উপগ্রহগুলির রাসায়নিক পদার্থ, তাদের ঘূর্ণন, তাদের উপগ্রহের সংখ্যা এবং এসব গ্রহ-উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের ধারণা পাওয়ার জন্য নাসা প্রাথমিকভাবে ১৯৭৭ সালে ফ্লোরিডার ক্যাপকেনাভেরাল থেকে দুটি মহাকাশযান ভয়েজার-১, ভয়েজার-২ প্রেরণ করে। প্রথমে নাসা ১৯৭৭ সালে ২০ আগস্ট উেক্ষপণ করে, যারা বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন অনুসন্ধানের কাজ করবে, পরে ভয়েজার-১ ৫ সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে উেক্ষপণ করা হয়, যেখান থেকে ভয়েজার-১ ১৯ ঘণ্টা ও ভয়েজার-২ ১৬ ঘণ্টা পরপর বার্তা প্রেরণ করে, যারা ২১.৭৮ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। মহাকাশযান দুটি মহাকাশে যত সময় অতিবাহিত করছে ততই তাদের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাই নাসা রেডিও সিগন্যাল Distributing স্থাপন করেছে, সেখান থেকে অতি সহজে বার্তা গ্রহণ করা যাচ্ছে। মহাকাশযান ১৯৮৯ সালে সৌরজগতের অভিযান সমাপ্ত করে নক্ষত্র অভিযানের পথে ধাবিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে ডিসেম্বর এসটরয়েড বেল্ট অতিক্রম করেছিল। ভয়েজার-১ ১৯৯৮ সালে পাইওনিয়ার-১০-কে অতিক্রম করে। ২০০২ সালে ভয়েজার-১ ঘণ্টায় ৩৯ হাজার মাইল বেগে ৩৫ ডিগ্রি কোণে এবং ভয়েজার-২ ৪৮ ডিগ্রি কোণে প্রতি ঘণ্টায় ৩৪ হাজার মাইল বেগে গমন করে। কয়েক হাজার বছর পরে এগুলি আমাদের সূর্যের মতো অনেক নক্ষত্রের খোঁজ করবে। অতঃপর কয়েক মিলিয়ন বছর পর আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে পৌঁছাবে। এরা কয়েক মিলিয়ন বছর সক্রিয় থাকবে। আমাদের প্রতিবেশী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এবং পরিশেষে ধ্বংস হতে পারে। এগুলোর ভেতরে একটি তামার ডিস্ক থাকবে, যাতে কাল শ্যাগানের ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীর মানুষের জীবন, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বার্তা, ৫৫টি ভাষা, ১৬৬টি সাদা ও রঙিন ছবি থাকবে। এতে থাকবে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র, সৌরজগতের ছবি, ডিএনএ, কলকাতার রাস্তার জ্যাম, চীনের প্রাচীর, ভারতের তাজমহল, গর্ভবতী নারী, স্তন্যপানরত মা ও শিশুর ছবি। মহাশিল্পীর গান, আমেরিকার জিমি কার্টারের বাণী, পৃথিবীর মানবসভ্যতা এবং সংস্কৃতির কথা। মোটকথা, মহাকাশযানগুলো মানবসভ্যতার দূত হিসেবে কাজ করবে।
গত শতাব্দীর জ্যোতির্বিদরা বিশ্বাস করতেন যে, একমাত্র পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, অন্য কোথাও নয়। এটা ছিল তাদের বদ্ধমূল ধারণা, কিন্তু বর্তমান সময়ের তথ্য-উপাত্ত তাদের সেই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। আর এর শুরুটা হয়েছে ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর, যখন মাইকেল মেয়র এবং ডিডিয়ার কোয়েলজ বৃহস্পতির অর্ধেক ভরসম্পন্ন গ্রহ আবিষ্কার করেন। গ্রহটি ‘৫১ পেগাসি’ নক্ষত্রের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। উল্লেখ্য, বৃহস্পতির ‘ইউরোপা’ উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে। আবার শনির ‘টাইটান’ উপগ্রহে প্রাণী বাস করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
যদিও এ আবিষ্কারের পর আরো ১২২টি এক্সট্রা সোলার প্লানেট আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু এগুলো আমাদের সোলার সিস্টেমের মতো নয়। তবে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার জন্য কোরেট-২০০৬, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি। পর্বতসদৃশ গ্রহ, কেপলার-২০০৭, পৃথিবীর সদৃশ ইন্টার ফেরোমিস্টি-২০০৯, নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয়ের ফাইন্ডার (২০১২-২০১৫) ও ডারউইন-২০১৪-সহ প্রায় আটটি মহাকাশযানে এই বিশাল কাজ করবে। তা ছাড়াও চিলির (ইএসও) সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীসদৃশ বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান পেয়েছে গত জুলাই, ’০৬ সৌরজগতের বিশাল আকৃতির একটি বস্তু আবিষ্কৃত হয়। প্রাথমিকভাবে যার নাম দেওয়া হয় ২০০৩ ইউবি ৩১৩, যা প্লুটোর চেয়েও বড় এবং সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। পরে এর নাম দেওয়া হলো জেনা। আবার আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিয়নের অন্যতম আবিষ্কারক মাইক ব্রাউন জেনাকে নতুন নাম দিয়েছেন—এরিস। নামটি দেওয়া হয়েছে কলহপ্রিয় গ্রিক দেবী এরিসের নামে। এরিস সূর্য থেকে ৯৭ অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিট দূরে।
সম্প্রতি সানফ্রানসিসকোতে বিজ্ঞানীরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, প্রাচীনকালে মঙ্গলগ্রহে পানি সমৃদ্ধ ছিল এবং প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। নাসার তোলা ছবিতে মঙ্গলের গিরিখাদ, ফাটল ও হালকা, গাঢ় রঙের শিলাখণ্ডের সন্ধান মিলেছে। আবার মঙ্গল গ্রহের নিচে পানি থাকতে পারে। কারণ বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে মিথেন আছে। নাসার বিজ্ঞানী ঠোরি হোয়েশম্লার বলেছে যে, পানি ও শিলাখণ্ডের সংযোগের ফলে জীবন গঠনের পুষ্টি উত্পন্ন হয়। কারণ শিলাখণ্ড থেকে হাইড্রোজেন উত্পন্ন হয়।
সম্প্রতি সূর্যের চেয়ে প্রায় দেড়শ গুণ বড় এক বিশাল নক্ষত্র বিস্ফোরিত হওয়ার খবর জানিয়েছেন নাসা। এর নাম এসএন ২০০৬ জিওয়াই, যা আমাদের সৌরজগত্ থেকে ২৮ কোটি আলোককর্ষ দূরে। এই বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রটি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা ও অন্যান্য বিষাক্ত বায়বীয় উপাদান ১০ লাখ আলোকবর্ষ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে পৃথিবীর প্রাণিজগত্ বিলুপ্তির আশঙ্কা ৮০ শতাংশ। আজ পৃথিবীর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে নক্ষত্রের গ্রহের মধ্যে সত্যই কি প্রাণী থাকবে? মঙ্গলের কোনো এক প্রান্তে বাস করবে কি অধিক জনসংখ্যার পৃথিবীর মানুষ, না মানবসভ্যতার মধ্যে মঙ্গলগ্রহ অমঙ্গল বয়ে আনবে? প্লুটো এতদিন গ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেন-বা তাকে গ্রহের সদস্য থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। থাক না প্রকৃতির কোলে। প্রাণিজগত্ কি ৮০ শতাংশ সত্যিই বিলীন হবে জিওয়াই নক্ষত্রের বিস্ফোরণের মাধ্যমে। নব নব তথ্য ও তত্ত্বের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হোক মহাকাশ বিজ্ঞানের ভান্ডার। এ প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর।
n লেখক: প্রভাষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
স্কুল অ্যান্ড কলেজ
