ভাড়াটে খুনিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ভাড়াটে খুনিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত এক মামলায় দণ্ডিত খুনির মৃত্যুদণ্ড হ্রাস চেয়ে আবেদন করলে তা সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ বলেছে, ভাড়াটে খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কমানোর বিষয়টি নমনীয় দৃষ্টিতে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অতীতে এ ধরনের খুনিদের আমরা কোনো ছাড় দেইনি। এখনো দেব না। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল এমন মন্তব্য করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
একই সঙ্গে ঐ হত্যা মামলায় ভাড়াটে খুনি মিজানুরকে নিম্ন আদালতের দেওয়া এবং হাইকোর্টের অনুমোদন পাওয়া ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেন।
এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এক নারী খুনের ঘটনায় ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে দুই ভাড়াটে খুনিসহ স্বামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এছাড়া আরো কয়েকটি মামলায় ভাড়াটে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রেখে রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ। এদিকে আজ বুধবার তানিয়া হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ভাড়াটে খুনি শাহীন আলমের আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
খুন করে সাজানো হয় ছিনতাইয়ের নাটক
স্ত্রী তাহমিনা শারমিন তানিয়াকে (২৮) হত্যার পরিকল্পনা করেন স্বামী জাহিদ হোসেন জুয়েল। সেজন্য সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেন। সাজান ছিনতাই পরিকল্পনার নাটক। সেই পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যান কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুয়াকাটার পর্যটন হলি হোমসে উঠেন তারা। সেখান থেকে প্রাইভেট কারে করে সমুদ্রসৈকত ঘুরতে যান। রাতে ফেরার পথে পরিকল্পনা অনুযায়ী তানিয়াকে গাড়ির ভেতর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন খুনি মিজানুর রহমান মিজান। কিন্তু পুলিশের তদন্তে ছিনতাই নয়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খুনের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এই মামলায় ২০০৮ সালে দুই ভাড়াটে খুনি মিজান ও শাহীনসহ স্বামী জাহিদকেও মৃত্যুদণ্ড দেয় পটুয়াখালীর জেলা ও দায়রা জজ আদালত। হাইকোর্ট ঐ রায় বহাল রাখে। পরে ২০১৭ সালে আপিল খারিজ করে জাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ।
গতকাল আপিল বিভাগে খুনি মিজানের আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে তার আইনজীবী মুহাম্মদ আশরাফ আলী দাবি করেন, গ্রেফতারের তিন দিন পর মিজানকে আদালতে তোলা হয়। এর আগে তাকে র্যাব অফিসে রাখা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আরেক আসামি শাহীনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যদিও গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার কথা। এ পর্যায়ে বেঞ্চের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, তানিয়ার স্বামী জাহিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পড়লে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটা ঠান্ডা মাথার খুন ছিল। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ বলেন, আসামি মিজানকে দেরি করে আদালতে হাজির করেছে সেটা নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট বিবেচনা করে ফাঁসি বহাল রেখেছে। তবে মামলার নথি দেখলে দেখা যায়, এই আসামিকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। আর আসামি গ্রেফতারের পর পুলিশকে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেক্ষেত্রে এখানে দেরির বিষয়টি মুখ্য নয়। এ সময় তিনি এ বিষয়ে বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণ পড়ে শোনান। এ পর্যায়ে আসামির আইনজীবী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই আসামি কনডেম সেলে রয়েছেন। এখন ফাঁসি কমানোর বিষয়টি আপনারা বিবেচনা করতে পারেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী বলেন, আমরা ভাড়াটে খুনিদের ছাড় দেই না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরননগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হত্যা মামলায় দুই ভাড়াটে খুনিকে ছাড় দেইনি। তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছি। তিনি বলেন, খুনের মামলায় যেখানে কঠোর মনোভাব নেওয়া দরকার সেখানে সেটাই নেওয়া হচ্ছে। কোনো ছাড় দিচ্ছি না। যেমন আজকেও শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এক খুনির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছি। এর পরই আপিল বিভাগ মিজানের ফাঁসি বহাল রাখার আদেশ দেয়।
প্রসঙ্গত ২০০০ সালে গার্মেন্টস কর্মী অন্তঃসত্ত্বা নাসিমা আক্তারকে খুনের দায়ে তার স্বামী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও দুই ভাড়াটে খুনি শহীদুল ইসলাম ও খোরশেদের মৃত্যুদণ্ড গত বছর বহাল রাখে আপিল বিভাগ।
