আমরা জীবন পরিচালনার জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করি, যে বিশ্বাস নিজের মধ্যে ধারণ করি, মনেপ্রাণে যা বিশ্বাস করি তা-ই ধর্ম। ধর্ম আমাদের প্রত্যেকের কাছেই স্পর্শকাতর বিষয় ও আবেগের অন্যতম একটি জায়গা। নিজের ধর্মকে অন্য কেউ আঘাত করে কোনো ঘটনা ঘটাক কিংবা কথা বলুক তা আমাদের কারোরই কাম্য নয়, এতে কেবল শুধু সাম্প্রদায়িকতাই বাড়বে তা নয়, সেই সঙ্গে বাড়বে তিক্ততা। কিন্তু কেন বারবার ঘটছে এমন ঘটনা? কেন হেনস্তা হচ্ছি একে অপরের কাছে? কেন আমরা পারছি না অসাম্প্রদায়িকভাবে অবস্থান করতে? কেন প্রশ্ন আসছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠের? কেন তৈরি হবে মানুষের ভেতর বিষবাষ্প?
প্রতিটা ধর্মই মানুষকে শান্তির পথে উদাত্ত আহ্বান করে থাকে, সত্ উপদেশ দিয়ে থাকে। জীবনকে সুন্দর এক শৃঙ্খলের ভেতর আবদ্ধ করতে সহায়তা করে। আমি যে ধর্মের অনুসারীই হই না কেন, আমি যদি আমার ধর্ম সঠিকভাবে ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করি, তাহলে আমার দ্বারা কখনো কোনো দিন অন্যায় কার্যকলাপ পরিচালিত হতে পারে না, কারো ক্ষতি সাধন হতে পারে না। হতে পারে না কারো কাছে বিষোদ্গারের কারণ। প্রকৃত শান্তির ধারক ও বাহক কখনোই সমাজ ও দেশের অশান্তির কারণ হতে পারে না।
এই যে যারা অন্যের ধর্মকে আঘাত করছে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে, তারা কি আদৌ ধার্মিক? পৃথিবীর কোনো ধর্মেই বলা হয়নি অন্যের ওপর জোর-জবরদস্তি-জুলুম-অন্যায়-অবিচার কিংবা অন্যকে আঘাত করে ধর্মের নামে অধর্মের ছড়াছড়ি করতে! সবখানেই বলা রয়েছে, সম্প্রীতি-ভ্রাতৃত্ববন্ধনের কথা। শান্তিপূর্ণভাবে অন্যের ধর্ম পালনের কথা। অধিকার সংরক্ষণের কথা। কিন্তু কেন আমরা ব্যর্থ হচ্ছি এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে?
হাজার বছর ধরে নানা ধর্মের মানুষ এই ভূখণ্ডে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছিল সবার সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমেই। এদেশে সব ধর্মের মানুষ একে অন্যের সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসার যে ঐতিহ্য, সেখানে আজকাল অনেক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে, মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ভাব বেড়ে যাওয়ার কারণ কী, এই বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।
ইদানীংকালে আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা সত্যিই শঙ্কাজনক। কারণ, যখন কোনো রাষ্ট্রের স্বজাতির মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়, সে রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। বিশ্ব ইতিহাস তা-ই বলে। যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বৃহত্ ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে দুটো স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল, তার একটিতে অর্থাত্ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠরা পাকিস্তানে ও অন্যটিতে হিন্দুধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠরা ভারতে চলে যায়। কিন্তু ধর্ম আমাদের পাকিস্তানের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারেনি, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির বৈষম্যই আমাদের চালিত করেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের পথে। আমাদের রয়েছে শক্তিশালী হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতির বটবৃক্ষের শেকড় অনেক গভীরে। যে সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মৃত্তিকাসংলগ্ন, মানবিক ও সহনশীল হতে শিখিয়েছে আমাদের, সেই সংস্কৃতিকে আমরা বলে থাকি বাঙালি সংস্কৃতি। এদেশের হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবারই রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি পালনের চিরায়ত উত্তরাধিকার। যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আমাদের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে পথ দেখিয়েছিল। আজ তবে কেন সে চেতনা ভূলুণ্ঠিত, যে চেতনায় বাংলাদেশ নামক দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলাম? কেন আমরা আজ আবার পেছনে ফিরে যাচ্ছি? এ প্রশ্নগুলো করার সময় এসেছে এখন। উত্তরও খুঁজতে হবে আমাদের। নতুন প্রজন্মকে কেন আমাদের নেতৃত্ব সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছে না, গড়ে তুলতে পারছে না মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, সে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন মনে জাগে- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পারিবারিক শিক্ষা এসব কিছু কি সঠিক পথে নেই? যার ফলাফল হয়তো আমরা হাতেনাতে পাচ্ছি। যদি এর উপযুক্ত কারণ বিশ্লেষণ করে এখনই ঘুরে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে আমাদের পূর্বসূরিদের সমস্ত অর্জন উত্তরসূরিদের মধ্যে হারিয়ে ফেলব।
n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
