মামলা পরিচালনায় কত টাকা ফিস দেওয়া হয়েছে সেটা কখনো গুনে দেখতেন না। অসংখ্য মামলা করেছেন বিনা পয়সায়। সেই গরিবের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার আর নেই। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা ১৮ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এই আইনজীবীর মৃত্যুতে আইন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকাজ বন্ধ রাখা হয়। বিচার কাজ বন্ধ ছিল ঢাকার নিম্ন আদালতেও। পরে বাদ জোহর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আনা হয় মরদেহ। সেখানে বিচারপতি, আইনজীবী, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ জড়ো হন। পরে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন।
বেশ কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বাসেত মজুমদার। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা রেখে গেছেন। আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন ৫৬ বছর।
প্রবীণ এই আইনজীবীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। শোক প্রকাশ করে আরো বিবৃতি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।
এদিকে বাদ জোহর তার প্রথম নামাজে জানাজায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম-সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও আফজাল হোসেন, জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষ।
বাসেত মজুমদারের ছেলে অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘আমার বাবা অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি যদি কারো কাছে কোনো অঙ্গীকার করে থাকেন তাহলে আমাকে জানাবেন তা পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল মরহুমের বর্ণাঢ্য জীবনের অংশ বিশেষ তুলে ধরেন। জানাজা শেষে মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার জন্মস্থান কুমিল্লায়। সেখানে লালমাই উপজেলার হরিশ্চর হাইস্কুল মাঠে তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কুমিল্লা সদর আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে তাকে নিজ বাড়ি শানিচোঁ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
১৯৩৮ সালের পহেলা জানুয়ারি কুমিল্লার লাকসামে শানিচোঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। ষাটের দশকে ঐতিহাসিক সব আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি। দুই মেয়াদে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জেপির শোক :জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে দেশ একজন শীর্ষ স্থানীয় আইনজীবীকে হারাল; যিনি গরিবের আইনজীবী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। একই সঙ্গে তার রুহের মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান নেতৃবৃন্দ।
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ, কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকার সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. মশিহুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. রুবেল হাওলাদার এক বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেছেন।
