প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ যে কোনো জাতীয় প্রয়োজনে এই বাহিনীকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সর্বদা প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ জাতীয় যে কোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত থাকবে।’ গতকাল বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুজিব রেজিমেন্ট আর্টিলারি ও রওশন আরা রেজিমেন্ট আর্টিলারিকে পতাকা হস্তান্তর এবং সেনাবাহিনীর ১০টি ইউনিটকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সদর দপ্তর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গতকাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনটি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি ও একটি এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট আর্টিলারি, দুটি রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, দুটি সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন, আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ এবং এনসিও একাডেমিকে জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান এবং মুজিব রেজিমেন্ট আর্টিলারি ও রওশন আরা রেজিমেন্ট আর্টিলারির প্রবর্তিত নতুন পতাকা প্রদান প্যারেড আর্টিলারি সেন্টার অ্যান্ড স্কুল, হালিশহর, চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে ভিডিও টেলি কনফারেন্স (ভিটিসি)-এর মাধ্যমে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বর্ণিত ইউনিট/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানসমূহকে জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) ও রেজিমেন্টাল পতাকা প্রদান করেন। দেশ সেবা ও জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য সামরিক ইউনিটসমূহকে জাতীয় পতাকা প্রদানের জন্য স্বীকৃতি জানানোর রীতি প্রচলিত রয়েছে। জাতীয় পতাকা (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) প্রদান প্যারেড শেষে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ সেনাবাহিনীকে একটি প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক সাজসজ্জায় সজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী দেশ গঠন ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ ও অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং অন্যান্য পদবির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান থেকে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলাসহ আর্থসামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপারেশন কোভিড শিল্ড’-এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সদস্যগণ করোনা প্রতিরোধকল্পে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং বিভিন্ন বৈদেশিক মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের আত্মত্যাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে সম্মান ও মর্যাদা। প্রধানমন্ত্রী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি’। তিনি বলেন, আজ ‘জাতীয় পতাকা’ আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। এই বিরল সম্মান ও গৌরব অর্জন করায় আমি ৪, ১২ ও ২০ ফিল্ড, ৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ৫ ও ৭ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ১ ও ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন, আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ এবং এনসিও একাডেমিকে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত মুজিব ব্যাটারির কামানের গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে ঘোষিত হয়েছিল ‘রেজিমেন্ট অব আর্টিলারি’র গৌরবময় পথচলা। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে মুজিব ব্যাটারি ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। যা বিভিন্ন প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ, আভিযানিক কর্মকাণ্ড এবং প্রতিযোগিতার কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ২০১৯ সালে ‘রেজিমেন্টাল কালার’ এবং ২০২০ সালে গৌরবময় ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ অর্জন করে। তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করা এই রেজিমেন্টকে জাতির পিতার নামানুসারে ‘মুজিব রেজিমেন্ট আর্টিলারি’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, আজ মুজিব রেজিমেন্ট আর্টিলারির কাছে ‘নতুন পতাকা’ হস্তান্তর করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে তত্কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রওশন আরার আত্মত্যাগ বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার উত্স ছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকে সম্মানিত এবং স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর জন্মলাভ করে ‘রওশন আরা ব্যাটারি’। তিনি বলেন, যুদ্ধপরবর্তী ১ মে ১৯৭২ সালে ‘রওশন আরা ব্যাটারি’, ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন প্রশাসনিক, প্রশিক্ষণ, আভিযানিক কর্মকাণ্ড এবং প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এই ইউনিট ২০১৯ সালে ‘রেজিমেন্টাল কালার’ এবং ২০২০ সালে গৌরবময় ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ অর্জন করে। আজ রওশন আরা রেজিমেন্ট আর্টিলারির কাছে ‘নতুন পতাকা’ হস্তান্তর করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
তিনি এ সময় ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লা মিলিটারি একাডেমিতে প্রথম ব্যাচের ক্যাডেটদের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে জাতির পিতার দেওয়া ভাষণের চুম্বক অংশ উদ্ধৃত করেন। জাতির পিতা বলেন, ‘আমার মনে আজ যে কী আনন্দ, তোমাদের আমি তা ভাষায় প্রকাশ করে বলতে পারব না। যখন আমি আগরতলা মামলায় বন্দি ছিলাম, যখন পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী জেলে বন্দি ছিলাম, তখন ভাবতে পারিনি, একদিন এখানে তোমাদের প্যারেড হবে।’ ‘এই মিলিটারি একাডেমি একদিন বিশ্বব্যাপী নাম করবে এবং সারা বিশ্বের মানুষ এই মিলিটারি একাডেমি দেখতে আসবে’ বলে তিনি সে সময় আশা প্রকাশ করে যান মর্মে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা আমাদের মিলিটারি একাডেমিকে সেভাবেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার মান উন্নয়নের জন্য ফাইবার অপটিক ব্যবহারের পাশাপাশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কোভিড-১৯-এর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি একটি সুশৃঙ্খল ও মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ উপহার দেওয়ার জন্য অংশগ্রহণকারী এবং ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে আয়োজন করায় সেনাবাহিনী প্রধান, জিওসি আর্টডক, জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশন এবং কমান্ড্যান্ট আর্টিলারি সেন্টার ও স্কুলকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
