জাপানের রাজকুমারী কি রবীন্দ্রনাথের আশা কবিতাটি কখনো পড়িয়াছেন? সেই কবিতায় বলা হইয়াছে—‘বহুদিন মনে ছিল আশা/ ধরণীর এক কোণে/ রহিব আপন-মনে;/ ধন নয়, মান নয়, একটুকু বাসা/ করেছিনু আশা।’ জাপানের রাজকুমারী মাকো রাজবাড়ি নহে, আমজনতার মতো সাধারণ ঘর বাছিয়া লইলেন। শৈশব হইতে রাজপ্রাসাদের বৈভব উপভোগ করিবার পর কেন তিনি বিলাসবহুল জীবনের মোহ ছাড়িয়া আমজনতার স্রোতে মিশিয়া যাইতে চাহিলেন। বিবাহ করিলেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে। পাত্রের নাম কেই কোমুরো, যিনি রাজকুমারীর মাকোর বহু দিনের হূদয়সঙ্গী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িতে পড়িতেই তাহাদের ভাব-ভালোবাসা জমিয়া উঠে। একপর্যায়ে রাজকুমারী মাকো তাহার দাদা সম্রাট আকিহিতোর মতোই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলেন। সম্রাট আকিহিতো একসময় মনঃস্থির করিয়া ফেলিয়াছিলেন রাজদণ্ড রক্ষার গুরুদায়িত্ব তিনি আর পালন করিবেন না। তখন তাহার বয়স ছিল ৮৩ বত্সর। তাহার নাতনি রাজকুমারী মাকো জীবনের এত অধিক সময় ক্ষেপণ করেন নাই। তিনি তাই সিদ্ধান্ত লইলেন, রাজ্যপাট হইতে নিজেকে মুক্ত করিবার। আমরা রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ কিংবা সেলিম-আনারকালির কাহিনি জানি। এই সকল কাহিনির মূল সুর হইল—ভালোবাসার পথ কখনো মসৃণ হয় না। প্রবাদে আছে, অভাব যখন দরজায় আসিয়া দাঁড়ায়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়া পলায়ন করে। কিন্তু ভালোবাসা মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার মূল সূত্র। সেই সূত্র কোনো প্রতিবন্ধকতা মানে না।
জাপানের রাজকুমারী মাকো কয়েক বত্সর পূর্বেই ঘোষণা দিয়াছিলেন তিনি অত্যন্ত সাধারণ ঘরের প্রেমিকপ্রবর কমুরোকে বিবাহ করিবেন। গত ২৬ অক্টোবর তাহারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। ২০১২ সালে টোকিও আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তাহাদের দুই জনের প্রথম সাক্ষাত্ এবং ভালো লাগার সূত্রপাত হয়। রাজকুমারীকে বিবাহের মাধ্যমে অত্যন্ত সাধারণ ঘরের সন্তান কমুরোকে ‘সাধারণত্ব’ হারাইতে হইল, আর রাজকুমারী মাকোকে হারাইতে হইল তাহার রাজকীয় ‘অসাধারণত্ব’। কারণ, প্রেমিককে বিবাহ করিতে গিয়া রাজকীয় মর্যাদা ত্যাগ করিতে হইয়াছে রাজকুমারী মাকোকে। বিবাহের পর তাহারা সম্ভবত ঘর পাতিতেন আমেরিকায়। রাজকুমারী মাকোর রাজকীয় বিষয়ের প্রতি এতটাই বৈরাগ্য আসিয়াছে যে, রাজপরিবারের বাহিরে কোনো রাজকুমারী বিবাহ করিলে রাজপরিবারের তরফ হইতে যেই এককালীন অর্থ প্রদান করা হয় তাহা লইতেও তিনি অস্বীকৃতি জানাইয়াছেন। যদিও জাপানি রাজবংশের নিয়মে রাজদায়িত্ব শুধুই পুরুষের হাত হইতে যায় ভবিষ্যত্ পুরুষের হাতে। বংশের নারীরা রাজকুমারী হইতে কোনো দিন রানি হইতে পারিবেন না। রাজার মৃত্যুর পর রানির হাতে রাজদণ্ড যাইবে না। এবং রাজবংশের বাহিরে কাউকে বিবাহ করিলে তাহাকে রাজবংশও ছাড়িতে হয়। ইহার পূর্বে রাজকুমারী মাকোর এক ফুপুও একইভাবে বিবাহ করিয়াছিলেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে। এই জন্য তাহাকেও ত্যাগ করিতে হইয়াছিল রাজবংশ।
৩০ বত্সর বয়সি রাজকুমারী মাকোর না হয় সিংহাসনে ভাগীদার হইবার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি তো ছিলেন রাজসিংহাসনের দাবিদারদের একজন! কিন্তু তিনিও ‘অতি সাধারণ’ মেগানকে বিবাহ করিয়া একপর্যায়ে ত্যাগ করিতে বাধ্য হন রাজকীয় উপাধি ও দায়িত্ব। গত বত্সর প্রিন্স হ্যারি ও তাহার স্ত্রী মেগান যৌথ বিবৃতিতে জানাইয়াছেন—তাহারা এখন হইতে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হইবার জন্য কাজ করিতে চাহেন। সুতরাং মার্ক টোয়েনের ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার’ কাহিনির মতো করিয়া বলা যায়, নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা অনন্ত দুঃখ—উভয়ের মধ্যে একটি মিল রহিয়াছে। ইহার কোনোটাই ভালো নহে। তাহা হইলে ভালো কোনটি? বৈচিত্র্য হইল এই জগতের অস্তিত্বের মূলে। সুতরাং বৈচিত্র্যের অভাব মানুষের জীবনের বাস্তুসংস্থানও দুর্বল হইয়া যায়, ঝিমাইয়া পড়ে। বৈচিত্র্যই এই জগতের চালিকাশক্তি, বৈচিত্র্যপিয়াসিদের নিকট বৈচিত্র্য বিহনে রাজপ্রাসাদও পানসে হইয়া যায়। বিবাহের পর মাকো তাহার স্বামীর ব্যাপারে বলিয়াছেন, ‘কেই আমার কাছে অমূল্য।’ কেই কোমুরোকে বিবাহ করিতে মাকো তাহার রাজপদবিও বিসর্জন দিয়াছেন, কারণ আইনানুযায়ী একটি দম্পতি শুধু একটি পদবি ব্যবহার করিতে পারেন।
অভিনন্দন মাকো ও তাহার জীবনসঙ্গী কেই কোমুরকে, বৈচিত্র্যময় জীবন বাছিয়া লইবার জন্য।
