যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে গড়ে তোলা সহযোগিতা জোট কোয়াডের চার শীর্ষ নেতা এই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েছেন গত মাসে। সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনের সময় এই শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছাড়া এই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা। গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী দেশসমূহের এই জোট শান্তি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে বলে এ অঞ্চলের জনগণ প্রত্যাশা করে।
কোভিড সমস্যা ও তার মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তন ও সন্ত্রাসবাদ ছাড়াও বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চার শীর্ষ নেতা মতবিনিময় করেন। এই সম্মেলনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের তিন রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। কোয়াড সম্মেলনের শুরুতেই ভাষণ দেন মোদি। হিন্দিতে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি বলেন, ‘২০০৪ সালে সুনামির পর আমরা প্রথম সাক্ষাত্ করেছিলাম। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নই ছিল লক্ষ্য। এখন আবার একত্র হয়েছি এমন এক সন্ধিক্ষণে, গোটা বিশ্ব যখন কোভিড অতিমারিতে বিধ্বস্ত। মানবতার কল্যাণ এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন মুক্ত এশিয়ার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। সুগা ও মরিসন তাদের ভাষণে বিবিধ সমস্যার সম্মিলিত সমাধানের উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে দখলদারি থেকে মুক্ত রাখার ওপর জোর দেন। তারা বলেন, সমস্যা ও মতপার্থক্য থাকেই। তবে তা মতানৈক্যে যাতে পরিণত না হয়, সেজন্য গণতান্ত্রিক দেশের অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত। কোয়াডের লক্ষ্যও তা-ই। সব নেতাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমস্যার সমাধানের পক্ষে মত দেন।
নেতৃবৃন্দ বলেছেন, মুক্ত ও উদার এশিয়া গড়ে তোলা চারদেশীয় জোট কোয়াডের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করে তুলতে কোয়াড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চার দেশ তাদের গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে কোয়াডের সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তার করবে। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল তো বটেই, বিশ্বে শান্তি স্থাপনেও এই জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অন্যদিকে চীন, পাকিস্তানসহ সহযোগী অন্যান্য শক্তি এ ঐক্যকে তাদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জোট বলে মনে করেন। জোটের শক্তি ও দৃঢ়তায় শঙ্কিত হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ভারতকে মুসলমানশূন্য করার পরিকল্পনা বিষয়ে অভিযোগ তোলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের দিন ইমরান খান তার বক্তব্য দেন। ইমরান খান অভিযোগ করেন, ভারতের সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণেই সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।
ভারতের মুখপাত্র অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের তাদের বাড়ির উঠানে লালনপালন করে এই আশায় যে তারা শুধু প্রতিবেশীদের ক্ষতি করবে। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তান কর্তৃক সংখালঘুদের ওপর সহিংসতার পাশাপাশি এর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গণহত্যার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ভারতে বহুত্ববাদী গণতন্ত্র রয়েছে। সংখ্যালঘুদের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী, যারা দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে। পাকিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর হার ১২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২ শতাংশে। অন্যদিকে ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার হার সূচনায় ছিল ১০ শতাংশ, বর্তমানে তা ১৪.২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ভারতে বিশ্বমানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ রয়েছে। ভারত বিশ্বে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশে হিসেবে স্বীকৃত।
এখানে উল্লেখ্য, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জাতিসংঘে ভাষণে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য বিশ্বের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে ভারত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে আলোচনার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানান। কোয়াডের বৈঠকেও তিনি তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন।
আমরা জানি, আফগানিস্তান আবার তালেবানরা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা ধর্মান্ধতা এবং মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা নিয়ে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। নারী সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিপীড়িত হচ্ছে। মিয়ানমারেও সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক দল ও জনগণের ওপর নির্যাতন করছে। চীন, পাকিস্তান ও তাদের কিছু সহযোগী দেশ এব্যাপারে সহযোগিতা করছে। চীন বিআরআইর মাধ্যমে অন্য দেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলছে এবং অগণতান্ত্রিক শক্তিকে মদদ দিচ্ছে। চীনের অভ্যন্তরে তিব্বতি, উইঘুর এবং হংকংয়ের জনগণ নিপীড়িত হচ্ছে। তারা, বিক্ষোভের মাধ্যমে তা প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের ভাষণে নরেন্দ্র মোদি সন্ত্রাসবাদ, সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শান্তি স্থাপনের কথা বলেছেন। পাশাপাশি তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের অনুকরণীয় উন্নতির কথাও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কোভিড-১৯ টিকা আবিষ্কার, উন্নয়ন ও উত্পাদনেও ভারত অবদান রাখছে। ভারত ও মার্কিন কার্যকর আলোচনা এবং কোয়াডের বৈঠক বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারত মার্কিন সম্পর্ক আরো মজবুত হওয়ার বিষয়ে বাইডেন-মোদি উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুরুতেই বলেন, “এইভাবে, আমাদের কোয়াড সম্মেলন একটি ‘বৈশ্বিক কল্যাণের শক্তি’ হিসেবে কাজ করবে। আমি বিশ্বাস করি যে, কোয়াডে আমাদের সহযোগিতা ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর এবং সমগ্র বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।”
ভারত মার্কিন বৈঠক নিয়ে মোদির মন্তব্যে প্রসঙ্গে অন্যদিকে বক্তব্যের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘নতুন অধ্যায় শুরু করলাম। ভারত-আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই গণতন্ত্রের বন্ধুত্ব। এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ করোনা মহামারি। যত দিন যাবে বন্ধুত্ব আরো শক্তিশালী হবে।’ নজরকাড়া বিষয় হলো, এদিনের বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বক্তেব্যর মধ্যে গান্ধীজয়ন্তীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। যা তার মাত্র কয়েক দিন পরেই শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেছে প্রতিটি ভারতবাসী। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন প্রসঙ্গে বাইডেন যে মন্তব্য করেছেন তা টুইট করে জানান স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদি টুইট করে লিখেন, ‘প্রেসিডেন্ট গান্ধীজির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। গান্ধীজির সর্বদা একে অপরের ওপর ভরসার কথা বলতেন। ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও এই ভরসার সম্পর্ক বজায় থাকবে ভবিষ্যতে।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘আপনার নেতৃত্বে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে নতুন বীজ বপন করা হয়েছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকা পরস্পরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের আগে মোদি বৈঠক করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের সঙ্গেও।
উপরিউক্ত আলোচনা হতে এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, কোয়াড ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা চুক্তি করেছে। ফ্রান্স অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আগের সমঝোতার কারণে এ ব্যাপারে উষ্মা প্রকাশ করেছে। পরবর্তীকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। কোয়াড প্লাসে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও নিউজিল্যান্ড যুক্ত হয়েছে। ভারত-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব দেশই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও চেতনাগতভাবে কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত। আমরা আশা করি, কোয়াড শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও মুক্ত এশিয়া গড়বে।
n লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত
