‘আমার দেশেরই একটি জনগোষ্ঠী শুধু ধর্মপরিচয়ের কারণে তাদের বৃহত্তম ধর্মীয় উত্সব নির্বিঘ্নে, নিরাপদে ও আনন্দের সঙ্গে উদ্যাপন করতে পারল না। মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া এই দেশে এমন ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, এ দেশের মূল চেতনা ও নীতি ছিল—একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ও দেশটিকে সব মানুষের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। আমরা যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষ বলে দাবি করি, তাদের সবার জন্য এরকম সহিংসতার ঘটনা লজ্জাজনক।’ মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বলতে হচ্ছে, যে বিশ্বাস নিয়ে এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল সে যুদ্ধ অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছিল বলেই আজ পর্যন্ত এই স্বাধীন দেশে যত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে, তা ঘটত না। এই হামলা বাংলাদেশের ওপরেই হামলা।
১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হনুমানের প্রতিমার কোলে পবিত্র কোরআন পাওয়া গেছে এ খবরের বাহন ফেসবুক। কাজটি কে বা কারা করেছে, না জেনেই সে খবরের আগুনে পুড়িয়ে দিল রংপুরের পীরগঞ্জের একটি দরিদ্র জেলেপল্লি। কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনার পর থেকে শুরু করে যা কিছু ঘটছে, তা খুব সহজেই ঘটে যাচ্ছে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে। নির্বিচারে হামলায় আক্রান্ত ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ অসহায় অবস্থায় হাহাকার করছে। হামলার প্রথমদিকে মন্দির ও পূজামণ্ডপ লক্ষ্যবস্তু হলেও পরে তা ছড়িয়ে পড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার সেই পুরোনো অপকৌশলকে ব্যবহার করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করা হয়েছে।
ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তরা গদ্বাঁধা কথা আওড়াতে থাকেন—
‘আমরা সুনিশ্চিত কুমিল্লার ঘটনা সাজানো,’ ‘সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উপড়ে ফেলতে হবে,’ ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।’ এর পরও তাণ্ডব চলতেই থাকে এবং এ এক ধারাবাহিক গল্প।
গত ৯-১০ বছরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে ৩ হাজারেরও বেশি। ৫০ বছরের হিসাব নিশ্চয়ই আরো ভয়াবহ। প্রতিবারই একটি বিষয় লক্ষ করার মতো, হামলার পর অজ্ঞাতসংখ্যক আসামির বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা দিয়ে বিচারের প্রহসন ঝুলিয়ে রাখা। খবরের কাগজে, রাজপথে হয় প্রতিবাদ, শান্তিমিছিল, সমাবেশ, প্ল্যাকার্ড হাতে মানববন্ধন। অজ্ঞাত কারণে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং কেন জানি বিচারও থমকে যায়। কাউকে গ্রেফতার করা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত বিচার না হওয়ার কারণে ঘটনা আবার ঘটে। সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষকে হতাশ করে। প্রতিবেশীর অপমানে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে। সেই নিচু মাথার ওপর দিয়েই চলতে থাকে সন্ত্রস্ত জীবন। তবে আমারা এও দেখেছি, ২০১৩ সালে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের বিশাল উত্তেজনাকে কীভাবে দমন করা হয়েছিল, সরকার চেয়েছিল বলেই সম্ভব হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার দায় এড়াতে পারে না।
মনে করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান নামের একটি তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটেছে। ভূগোল, ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, অর্থনৈতিক কাঠামো কোনো দিক থেকেই পাকিস্তানের বহু দূরত্বের দুই অঞ্চলের মানুষ এক দেশ এক জাতি নয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের সেই সম্পর্কের অবসানে স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অভ্যুত্থান নবজাগ্রত এশিয়ায় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হঠাত্ করে নয়, এ দেশের মানুষের মনে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অঙ্কুরিত হয় বহু আগে থেকেই। দীর্ঘপথ বেয়ে নানা আন্দোলনে রক্ত ঢেলে তা বিকশিত হয় ।
বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ এবং বাংলার মুসলমান আমরা সবাই বাঙালি। জয় বাংলা স্লোগানের সঙ্গে এই মূল্যবোধই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। আজ সেই মূল্যবোধ কতটা নাজুক হয়ে পড়লে ফেসবুকের একটা স্ট্যাটাস মানুষকে এতটা নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে? কিন্তু যখন ফেসবুক ছিল না, তখনো তো এ সহিংসতার রূপ দেখেছি। কারা করছে? শত্রু সব সময়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই সুযোগে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল উঠছে। কলঙ্কিত হচ্ছে দেশ। দেশটি আমাদের সবার।
একটা দেশের মানুষ যখন আগ্রাসি শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করে তাকে আমরা সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধ বলি। একটা পর্যায়ে দেশটি স্বাধীন হলে মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা যে মুক্তি চেয়েছিলাম তার সমাপ্তি ঘটেনি। প্রকৃত অর্থে মানুষের মুক্তিযুদ্ধের কখনো সমাপ্তি ঘটে না। সৃষ্টির আদিকাল থেকে সে নানা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। একসময় নানা জীবজন্তু, প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার শত্রুর রূপান্তরও ঘটেছে। সাম্রাজ্যবাদ, শোষণসর্বস্ব পুঁজিবাদ, ধর্মান্ধতা এসব তো মানুষেরই সৃষ্টি। সভ্য মানুষ এদের রুখে দাঁড়াতেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, উদার জাতীতাবাদের ধারণা, ধর্মনিপেক্ষ মানবতাবাদী মূল্যবোধ, সমাজতন্ত্রের দর্শনকে।
শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ এবং বাঙালি জাতি হিসেবে গৌরবময় ঐতিহ্য চেতনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই সবই ছিল শক্তি ও প্রেরণা। এই চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
দেশ উন্নতির দিকে এগিয়েছে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু মানসিক অগ্রগতির পরিবর্তে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে পিছন পানে। বাঙালিত্বের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে বিকৃত ও অবমূল্যায়িত হতে দেখেছি। সে চাকায় যেন আরো গতি সঞ্চারিত হয়েছে।
রাষ্ট্রক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের তোষণ করেছে, স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়েছে। এখন দলভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদকে উত্সাহিত করা হচ্ছে, যার ফলাফল সংখ্যালঘুদের প্রতি অব্যাহত সহিংসতা। এ সহিংসতার দমন কি শুধু আইন করেই সমাধান হবে? আইন তো থাকতেই হবে। অপরাধের বিচার থাকতে হবে। একের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছাড়তে হবে। রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা, মনন ও বোধের উন্নয়ন ঘটে না। এ উন্নয়ন চাইলে শিক্ষা বাড়াতে হবে। শিক্ষাই পারে উদার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে। মুক্তকণ্ঠে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা তৈরি করে শিক্ষা। অথচ এই জায়গাতেই আমাদের চরম দৈন্যদশা।
দেশে এখন চলছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা আরো বাড়ছে। এভাবেই একদল ভোট ছাড়া ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। এখন যাদের ভোটে এদের নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল তাদেরকে তোয়াক্কা না করলেও চলছে। অতএব, জবাবদিহিরও প্রশ্ন নেই। ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক দল, সামাজিক আন্দোলনকারীদের ঘনিষ্ঠতা কমছে। আর সাংস্কৃতিক দলগুলো তো কোণঠাসা হয়ে আছে বহুদিন ধরে। এভাবে তো ভালো কিছু আশা করা যায় না। ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়া থেকে সহিংসতায় জড়িয়ে যদি সুবিধা ভোগ করা যায়, তাহলে সুবিধাভোগীরা পিছপা হবে কেন? এ যেন চোখ বন্ধ করে পথ চলার অবস্থা। কিন্তু কতদূর যাওয়া যাবে এভাবে? দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে। এখান থেকেই কি আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধটা শুরু করা যেতে পারে?
n লেখক : শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক
