ফ্রান্সের নারী অধিকার সংগঠনগুলো ‘বাচ্চা চাই, বাচ্চার বাবাকে নয়’ এমন দাবিতে বিগত বছরগুলোতে ভীষণ সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। ফলে আইনপ্রণেতারা বাধ্য হয়েছেন নতি স্বীকার করতে। এ দাবির পক্ষে-বিপক্ষে গত বছর এবং এ বছর কয়েক দফায় সংসদে ও সিনেটে প্রচণ্ড বাদানুবাদের পরে আইনটি অবশেষে এ বছর, অর্থাত্ গত ২৯ সেপ্টেম্বর ফরাসি জনপ্রতিনিধিদের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। এখন থেকে পুরুষকে পাশ কাটিয়ে কৃত্রিম উপায়ে সন্তান ধারণ নারীদের জন্য মোটেই আর অবৈধ হবে না। অর্থাত্, বাচ্চার সঙ্গে বাচ্চার বাবাকে মেনে নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকছে না। আইনটি কার্যকর হতে যাচ্ছে জেনেই মোটেই কালক্ষেপণ না করে আগস্টের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ পর্যন্ত ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৫০০ নারী এমন একক মাতৃত্বের ইচ্ছা নিয়ে চিকিত্সাকেন্দ্রগুলোতে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন।
কৃত্রিম উপায়ে সন্তান ধারণ নতুন নয়। ২৫ জুলাই ১৯৭৮ তারিখে জন্ম নিয়েছিল লুইস জয় ব্রাউন, বিশ্বের প্রথম টেস্টটিউব বেবি। মানবতার ইতিহাসে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এমন বিখ্যাত তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। আর মাত্র ৪৩ বছরের ব্যবধানে বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে মাতৃগর্ভের বাইরে সৃষ্ট ভ্রূণ থেকে জন্ম নেওয়া অর্থাত্ ইন ভিট্রো শিশুর সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের এমন উদ্যোগ ছিল সন্তান লাভে ইচ্ছুক মা-বাবাকে বন্ধ্যত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। ফরাসি আইনে এযাবত্কালে শুধু প্রাকৃতিকভাবে সন্তান জন্মদানে অক্ষম বাবা-মাকে এই পদ্ধতিতে সন্তান লাভ করার বৈধতা দিয়েছে, সবাইকে নয়। প্রযুক্তির এমন আশীর্বাদে বলীয়ান হয়ে এখন একক মাতৃত্বের দাবি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আইন বলছে, বিবাহিত ও অবিবাহিত অথবা সমকামী সব নারীই প্রযুক্তির কল্যাণে পুরুষকে পাশ কাটিয়ে সন্তান ধারণ করতে পারবেন। কৃত্রিম উপায়ে জন্ম নেওয়া সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হলে যদি সে জননকোষদাতার পরিচয় জানতে চায়, সে ক্ষেত্রে তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আর যেহেতু নারী-পুরুষের বিয়ের গড় বয়স বেড়ে গেছে অনেক, তাই যে কেউ ইচ্ছা করলে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের জননকোষ বা ভ্রূণ সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং সময়-সুযোগ বুঝে সন্তান ধারণ করতে পারবেন। কৃত্রিম উপায়ে সন্তান ধারণ তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নিষিদ্ধ থাকছে। এছাড়া মৃত ব্যক্তির সংরক্ষিত জননকোষ বা ভ্রূণ ব্যবহার করা যাবে না। ক্লোন করা যাবে না এবং অসত্ উদ্দেশ্যে মানবভ্রূণ নিয়ে গবেষণা চালানো যাবে না। সর্বোপরি সন্তান ধারণের জন্য অন্য নারীর গর্ভ ভাড়া করায় নিষেধাজ্ঞা আছে। নারীদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে সন্তান ধারণের জন্য ১৮ বছর বয়স থেকে সর্বোচ্চ বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ৪৫ বছর।
ফরাসি আইনপ্রণেতাদের মতে, এটা একধরনের পরীক্ষা। ইউরোপে ডিভোর্সের হার কমছে না এবং প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে। জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। নারী-পুরুষের বিয়ের গড় বয়স বেড়ে গেছে অনেক। মাতৃত্বের নিঃসঙ্গ দায়িত্ব যেসব নারী বেছে নিচ্ছেন, তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদে চাকরি করছেন। খানিকটা ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে নারীর দাবি সব সময় খুব সহজে আদায় হয়নি। রক্ষণশীলরা ১৯৬০-এর দিকে গর্ভনিরোধক বড়ি নিয়ে ভীষণ গোল পাকিয়েছিল। কিন্তু নারীরা এগিয়ে এলে তা বৈধ হয়। ১৭ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে ফ্রান্সের নারীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক তারিখ। এদিন পাশ হয়েছিল স্বেচ্ছা গর্ভপাতের আইনটি। এ আইনে নারীরা ইচ্ছা করলে গর্ভধারণের বারো সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নারীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অন্য কেউ সেখানে নাক গলাতে পারবে না।
তবে তার পরেও কথা থাকে। শিশুদের মনের খবর যারা জানেন, সেই শিশু মনোবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে তাদের জোড়া ভ্রু কুঁচকে মিনমিনে কণ্ঠে সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। তাদের মতে, শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য পিতৃস্নেহ অপরিহার্য। পারিবারিক গ্রন্থিবদ্ধ জীবনের আলোকহীনতায় গড়ে উঠতে পারে এককেন্দ্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা। সমাজে এর সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রভাব পড়বে। অপর পক্ষের যুক্তিও অবজ্ঞা করার মতো নয়। কারণ জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের গণনার হিসাব অনুযায়ী ফ্রান্সে বর্তমানে অবিবাহিত জননীর সংখ্যা ১৫ লাখ ৩০ হাজার। মাতৃত্বের নিঃসঙ্গ ও একক দায়িত্ব কেউ কেউ স্বেচ্ছায় বেছে নিলেও জীবনের টানাপোড়েনে এদের অনেকেই বাধ্য হয়ে এ দায়িত্ব পালন করছেন। তারা অনেকেই সন্তান উত্পাদনে বিয়ের অবশ্যকতা বা ছেলেমেয়ের লালনপালন শিক্ষার ব্যাপারে পিতৃসহযোগিতার প্রয়োজন আছে বলে মানতে চান না। আইন নাগরিক অধিকারকে নিশ্চিত করে। মাতৃত্বের বা পিতৃত্বের নিঃসঙ্গ এবং একক দায়িত্ব কেউ স্বেচ্ছায় বেছে নিতে চাইলে রাষ্ট্র সেখানে বাধা দিতে পারে কি? প্রযুক্তির কারণে সমাজ ও মানুষের গতানুগতিক চিন্তাধারা পালটে যাচ্ছে বলে অনেকের বিশ্বাস। সময়ের সঙ্গে সমাজকাঠামো পরিবর্তিত হবে এবং এই হওয়াটাই স্বাভাবিক তারা মনে করেন। একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে যারা নিজেদের বন্দি করে ফেলেছেন, চিন্তাচেতনায় তারা পেছনে পড়ে থাকবেন বলে তাদের অভিমত।
সে যাই হোক, সুন্দর একটি ফ্রেমে বাবা-মা-সন্তানকে ঘিরে যে চিরপরিচিত পরিবারের ছবিটি ছিল, সেই ছবিতে এখন ‘বাবা’ নামক অবয়বটি কি বিলুপ্ত হতে চলেছে? ভবিষ্যতই বলবে সবকিছু।
n লেখক : ফ্রান্সপ্রবাসী গবেষক
