বিশ্ব জুড়িয়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ইহার প্রভাবে শিল্প খাতের কাঁচামাল হইতে শুরু করিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যেরই আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত বাড়িয়াই চলিতেছে মূল্যস্ফীতির হার। বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হইবার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলির বিদ্যুত্ উত্পাদন, শিল্পোত্পাদন, পরিবহন, গৃহস্থালি ইত্যাদি প্রতিটি খাতেই চাপ সৃষ্টি হইবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি ঘুরিয়া দাঁড়াইতে শুরু করা মাত্রই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে উত্পাদনমুখী খাতের পরিবহন ব্যয়, পণ্যমূল্য ও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিকে নূতন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করিয়াছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপরও চাপ বাড়িয়া যাইবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করিতেছেন, জ্বালানির উচ্চমূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বিভিন্ন পণ্যের মূল্যস্ফীতি সারা বিশ্বেই সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করিতে পারে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িবে যাহা সার্বিকভাবে দেশগুলির নীতি নির্ধারণে চাপ বাড়িয়া যাইবার পাশাপাশি রাজনীতির জন্যও চ্যালেঞ্জের বিষয় হইয়া দাঁড়াইবে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করিতেছেন।
ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বাড়িয়া যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় যেই চাপ সৃষ্টি হইয়াছে তাহা উন্নত বিশ্বের দেশগুলির তুলনায় উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির জন্য অধিক উদ্বেগের কারণ হইবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই রহিয়াছে, যাহারা কলকারখানার জন্য শিল্পের কাঁচামাল, মেশিনারিজ হইতে শুরু করিয়া প্রায় প্রতিটি জিনিসই বিদেশ হইতে আমদানি করিয়া থাকে। যেহেতু সেই সকল দেশে উত্পাদন ব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল, কলকারখানার মেশিন ইত্যাদি সকল কিছুই আমদানি-নির্ভর এবং তাহারা এই সকল কোনো কিছুই উত্পাদন করেন না, সেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে অবধারিতভাবেই তাহাদের সামগ্রিক উত্পাদনব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় উত্পাদক বাধ্য হইয়াই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া খুচরা বাজারে ছাড়িতেছে; আর গ্রাহক কিংবা ভোক্তা পর্যায়ে তাহা সহনীয় কি না ইহা বিবেচনার সুযোগও তাহাদের থাকে না। ইহার ফলে ভোক্তা পর্যায়ের অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়, যাহা সামাজিক অস্থিরতাকে প্রভাবিত করিয়া থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বের যেই সকল দেশগুলি উত্পাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মেশিনারিজ নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে উত্পাদন না করিয়া বরং আমদানি-নির্ভর হইয়া অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়নের পথে অগ্রসর হইয়াছিল, সেই সকল দেশের কি পূর্বেই ভাবিয়া, চিন্তা করিয়া চলমান সংকটগুলির ন্যায় বিভিন্ন সংকটের বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত ছিল না? আমদানি-নির্ভর শিল্পায়নের ফলে যেই অপচয়, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস হইয়া থাকে সেই সকল বিষয়ও ভাবিয়া দেখা উচিত ছিল বইকি!
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে যেই অস্থিরতার তৈরি হইয়াছে তাহা আরো ভয়াবহ কোনো সংকটেরই ইঙ্গিত প্রদান করিতেছে। একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অস্থিরতা আর অপর দিকে বিশ্বের ক্ষমতাধর ও উন্নত দেশগুলির জ্বালানিকে কেন্দ্র করিয়া পারস্পরিক ঈর্ষা, বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামগ্রিক সংকটকে আরো গভীর করিয়া তুলিতেছে। এমতাবস্থায় বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির নীতিনির্ধারক হইতে শুরু উত্পাদনব্যবস্থার সঙ্গে যাহারা জড়িত সকলকেই দূরদর্শিতার সঙ্গে আসন্ন সংকট মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি লইতে হইবে। শীতপ্রধান দেশগুলিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ব্যাপক তুষারপাতের আশঙ্কার কথা জানাইয়া জনসাধারণকে বলা হয়, ‘টাইটেন ইয়োর বেল্ট’ অর্থাত্ সকল প্রকার পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করো। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিরও বর্তমান সংকট হইতে উত্তরণের জন্য ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ঠিক করিতে হইবে, সময় থাকিতেই বেল্ট টাইট করিয়া ফেলিতে হইবে। দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক উত্পাদন ব্যবস্থা লইয়া সুচিন্তিত পদক্ষেপ লইতে হইবে।
