শিক্ষাক্রমে প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ২১:০১

জাতীয় শিক্ষাক্রমের নতুন রূপলেখার খসড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দিয়েছেন। ২০২৩ সাল থেকে শিক্ষাক্রমের আলোকে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হবে। ধারণা করা হচ্ছে নতুন শিক্ষাকাঠামোয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষার সংখ্যা কমবে, মুখস্থবিদ্যা বন্ধ হবে, হাতে-কলমে অনুশীলন বাড়বে। সবদিক বিবেচনায় নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে বেকারের সংখ্যা হ্রাস পাবে! কিন্তু বাস্তবতা বড়ই ভয়াবহ। শিক্ষাক্রম বা কারিকুলাম প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা যেন শুধু সনদের জন্য না হয়ে জীবনমুখী হয়—এই ভাবনাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েকটি শিক্ষাকাঠামোয় দেখা গেছে যে, চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার মিল ছিল খুব সামান্যই। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে বছরের পর বছর। আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নদী, জলাশয়, সামগ্রিক প্রকৃতি-পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ও প্রকৃতি-পরিবেশ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত! নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নদী দখল-দূষণ ও ভরাট থামছে না। সময়ের পরিক্রমায় অনেক নদ-নদী আজ বিপন্ন। বনভূমি কমছে ছাড়া বাড়ছে না। কেন নদ-নদী ও প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস হলে শিক্ষার্থীদের মন কাঁদে না, কেন তারা বিচলিত হয় না! তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী শিক্ষা দিলো শিক্ষার্থীদের? বইয়ের সঙ্গে বাস্তব জগতের  তাহলে মিল নেই! এখনকার প্রজন্ম নদ-নদী ও প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কে অনেক বেশি উদাসীন। পাশের নদী-জলাশয় ভরাট, দখল-দূষণের ক্ষেত্রে ও গাছপালা কাটা হলেও সবাই যেন উটপাখির মতো মাটিতে মুখ লুকিয়ে থাকে! আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জাগিয়ে তুলতে পারছে বলে মনে হয় না। সময় এসেছে নতুন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জাগিয়ে তোলার। নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে শিক্ষার্থীদের নদী-জলাশয়ের সুরক্ষা, প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করার বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে কোনো দেশই এখন নিরাপদ নয়! পৃথিবীব্যাপী প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। মূলত জলবায়ুগত সমস্যার কারণে উন্নয়ন টেকসই ভিত্তি পাচ্ছে না। জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কমানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

নদ-নদী ধ্বংস হতে থাকবে আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব—এটা হতে পারে না। যে শিক্ষাব্যবস্থা দেশের নদ-নদী, প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার বাস্তবিক শিক্ষা দেয় না; সে শিক্ষাব্যবস্থা প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা নয়! শিক্ষাক্রমে ব্যবহারিক কাজে নদী-জলাশয় রক্ষার গুরুত্ব ও প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে আমাদের বেঁচে থাকার সম্পর্ক তুলে ধরতে হবে। নদী-জলাশয় দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাতে হবে। হাইকোর্ট দেশের সব জলাভূমি রক্ষা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলাভূমি রক্ষার ওপর প্রতি দুই মাস পরপর এক ঘণ্টার ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এমন সব প্রকৃতিবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হোক, এটাই কাম্য। এখনকার শিক্ষার্থীদের যদি প্রকৃতি-পরিবেশ ও নদনদী রক্ষায় সচেতন করা যায়, তাহলে আগামী দিনে তারাই হবে দেশের সামগ্রিক প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় পাহারাদার।

শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা স্কুলে ছাদবাগানের যত্ন নিচ্ছে, বিদ্যালয়ের চারপাশ সুন্দর করে সাজাচ্ছে। আবার শিক্ষার্থীরাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কোনো না কোনোভাবে ভুগছে। উন্নত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ শিশুকাল থেকে করে থাকে। শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জলাশয় সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বৃক্ষরোপণের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে নিজেদের টেকসই ভবিষ্যত্ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা সম্পর্কেও সচেতন হবে। পরিবেশপ্রেমি হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এই শিক্ষার্থীরাই সচেতন ও যোগ্য নাগরিক হয়ে দেশের হাল ধরবে। প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণে তখন আর গলা ফাটাতে হবে না! নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে তাদেরকে শুধু দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনামাফিক গড়ে তুলতে পারলে দেশটা অচিরেই বদলে যাবে।

ঢাকা