বড় নৌযান উদ্ধারে এখনো সক্ষমতা হয়নি

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ২২:৫৩

ব্যস্ততম পাটুরিয়া ঘাটে ডুবে যাওয়ার তিন দিন পরও আমানত শাহ ফেরি উদ্ধার কাজ শুরুই করতে পারেনি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। উদ্ধার কাজে ৫৬ বছরের পুরনো উদ্ধারকারী জাহাজ ’হামজা’ ব্যর্থ হওয়ার পর এক দশকের পুরনো ফিটনেসহীন ’প্রত্যয়’কে তলব করা হয়। তবে প্রত্যয়ের অক্ষমতা বিবেচনায় মাঝ পথেই ফেরত পাঠানো হয়। সব শেষে ডাকা                 হয় ৩৭ বছরের পুরনো ’রুস্তম’কে। ফিটনেসহীন অবস্থায় আছে-’নির্ভীক’। এই চারটি মাত্র উদ্ধারকারী জাহাজ দিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চলছে বিআইডব্লিউটিএ। যে ফেরিটি কাত হয়ে ডুবে আছে, তার লাইট ওজন হচ্ছে ৪৮০ টন। ডুবন্ত অবস্থায় বর্তমানে এর ওজন ৭০০ টনের বেশি। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম-পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ের উত্তোলন ক্ষমতা হচ্ছে ২৫০ টন এবং হামজা ও রুস্তমের সর্বোচ্চ উত্তোলন ক্ষমতা ৬০ টন। সেক্ষেত্রে উদ্ধারকারী জাহাজ আসার পরও এটি উত্তোলন করা সম্ভব নয়। চারটি উদ্ধারযানের সম্মিলিত উত্তোলন ক্ষমতা ৬২০ টন। কিন্তু বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযানগুলোর ওজন ৭০০ থেকে দেড় হাজার টন। তাই এসব নৌযান দুর্ঘটনাকবলিত হলে বিআইডব্লিউটিএ তা উদ্ধারে অক্ষম। বাস্তবে নদী মাতৃক বলে পরিচিত এই দেশের নৌপথে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটলেও দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চ বা জাহাজ উদ্ধারে নেই কোন অত্যাধুনিক নৌ-যান। ফলে উদ্ধার করতে না পেরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হয় অধিকাংশ নৌযান।  যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলার, পণ্যবাহী কার্গো ও ফেরি ডুবির দুর্ঘটনার পর তা নদীর তলদেশেই থেকে যায়। বিঘ্নিত হয় নৌচলাচল। এতে বন্ধ হয়ে যায় কোন কোন নদী পথ বা নৌ-ঘাট। কোনো নৌযানকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পর চ্যানেল থেকে একটু সরিয়ে বয়া দিয়ে চিহ্নিত করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ। কিন্তু স্রোতের কারণে নৌযানটি ঠিক জায়গায় থাকে না। ফলে যেকোনো সময় এসব পরিত্যক্ত নৌযানও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

এদিকে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এমপি ইত্তেফাককে বলেন, ফেরী ডুবে যাওয়ার এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম ঘটল। দেশে প্রতিনিয়ত ভারী নৌযান ও নৌ পরিবহনের সংখ্যা বাড়লেও সেই সব যান ডুবলে তা উদ্ধারের মতো জাহাজের সংকট প্রকট। আমাদের এখন আধুনিক ও সক্ষমতা সম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজের খুব প্রয়োজন। আমি নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ে থাকার সময় কোরিয়া থেকে ২৫০ টন উদ্ধারের সক্ষমতা সম্পন্ন দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহ করেছিলাম। পরে দুইটি ১২শ টন করে ২৪ শ টনের নৌযান উদ্ধারের সক্ষমতা সম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ ক্রয়ের জন্য প্রস্তাব প্রনয়ন করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ'র এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ উদ্ধারকারী জাহাজের সাহায্যে অতি সহজে নদীর তলদেশে নৌযানের অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু আধুনিক জাহাজ তো দূরের কথা বাংলাদেশে অহরহ উদ্ধার অভিযানে যাওয়া হামজা ও রুস্তমে ইকো সাউন্ডার পর্যন্ত নেই। হামজা ও রুস্তম চলত্শক্তিহীন। কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে টাগ বা অন্য জাহাজের সাহায্যে তাকে টেনে নিয়ে আসতে হয় দুর্ঘটনাস্থলে। টাগ বা জাহাজ প্রতি ঘন্টায় চার থেকে ৫ কিলোমিটার চলতে পারে। ভাটার সময় এর গতি আরো কমে যায়। লঞ্চ মালিক সমিতির একজন নেতা বলেন, দেশে বড় নৌযান উদ্ধার ব্যবস্থাপনা বলে আদতে কিছু নেই। হামজা-রুস্তমের আয়ুস্কাল পার হয়ে গেছে বহু আগেই, অন্য দুটিও চলছে ফিটনেস সনদ হালনাগাদ ছাড়াই।

জানা গেছে, আরিচা চ্যানেলে এই প্রথম কোন রো রো ফেরি ডুবে গেল। ডুবে যাওয়া আমানত শাহ ফেরিটি ৪২ বছরের পুরনো। এটা ১৯৭৯ সালে আরিচা ফেরি সেক্টরে যোগ হয়। ফেরির মাস্টার শরিফুল ইসলাম লিটন জানান, ৪ মাস আগে মেয়াদ উত্তীর্ন ফেরিটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ভারি মেরামত শেষে পাটুরিয়া সার্ভিসে আসে। তবে সম্প্রতি ফেরিটির তলদেশে একটি ফুটো হয়। সেটি মেরামত করার কথা ছিল। সেই ফুটো দিয়েই ফেরির ভেতরে পানি প্রবেশ করে বলে দাবি ট্রাক চালকদের।

এদিকে আমানত শাহ উদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় নৌযান ডুবেছে ৩৮৭টি। সক্ষম উদ্ধারকারী জাহাজের অভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ১৮১টি। যদিও নৌ সড়ক ও রেলপথ রক্ষাকারী কমিটির মতে, একই সময়ে ১ হাজার ৫০০ নৌযান দুর্ঘটনায় পড়েছে। নৌযান অনুমোদনহীন হওয়ায় অনেক দুর্ঘটনার খবর মালিকপক্ষ কর্তৃপক্ষকে জানায় না। বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির একজন নেতা বলেন, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ৫০০ থেকে ২ হাজার টনের বেশি পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের অনুমোদন দিচ্ছে। তাই দুর্ঘটনার শিকার হলে এ ধরনের নৌযান উদ্ধারে আরও উচ্চক্ষমতার উদ্ধারকারী জাহাজ বিআইডব্লিউটিএর থাকা প্রয়োজন।

এদিকে শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা বাবুল আকতার মঞ্জুর জানান, পন্যবোঝাই ১৪টি ট্রাক চারটি মোটরসাইকেল নিয়ে পাটুরিয়ায় ফেরি ডুবির ঘটনার ৩য় দিনে গতকাল শুক্রবার দুটি ট্রাক ও একটি কাভার্ডভ্যান উদ্ধার হয়েছে। এ নিয়ে ১২টি ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ একটি মাত্র মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। দুটি ট্রাক, তিনটি মোটরসাইকেল নদীতে নিমজ্জিত রয়েছে। হামজা নামে উদ্ধারকারী জাহাজ দিয়ে তত্পরতা চালানোর তিন দিনের মাথায় বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর  গোলাম সাদেক গতকাল শুক্রবার বলেন, চাঁদপুর থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় নাব্যতা সংকটের কারণে পাটুরিয়ায় আসতে পারবে না। তবে, মুন্সিগঞ্জ থেকে অপর উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম রওনা দিয়ে রাতের মধ্যে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। হামজা ও রুস্তমের প্রতিটির ৬০ টন ধারণ ক্ষমতার তুলনায় নিমজ্জিত ফেরি ভারি হাওয়ায় তা উদ্ধারে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, বেসরকারী উদ্যোগে ফেরি উদ্ধারের চিন্তা-ভাবনা চলছে।

উদ্ধার অভিযানের প্রধান বিআইডব্লিটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মোঃ ফজলুর রহমান জানান, ডুবে থাকা ফেরির মধ্যে সকল যানবাহন শনাক্ত করা হয়েছে। পলির কারনে উদ্ধার কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও আজ শনিবারের মধ্যে বাকি যানবাহন গুলো উদ্ধারের জোর চেস্টা চলছে। অপর দিকে, ফেরি ডুবির কারনে পাটুরিয়ার ৫নং ঘাটটি বন্ধ থাকায় ৩ ও ৪ নং ঘাটের পন্টুনযোগে ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোড করা হচ্ছে। দুটি মাত্র ঘাটযোগে লোড-আনলোড করায় যানবাহন পারাপারে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। গতকাল সন্ধা পর্যন্ত ফেরি পার হওয়ার জন্য পাটুরিয়ায় পাঁচ শতাধিক পন্যবাহী ট্রাক ও অর্ধশত প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস অপেক্ষায় ছিল।

’মাস্টারের অবহেলার কারণেই ডুবে যায় ফেরি’

এদিকে এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানান,তলা ফেটে নয় বরং ফেরির মাস্টার শফিকুল ইসলাম লিটন, সুকানি মানিক ও ইঞ্জিন চালক শাহিনুলের অবহেলায় ডুবে যায় ফেরিটি। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ফেরিটি পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে ছাড়ার আগে ফেরিতে অতিরিক্ত মাল বোঝাই ট্রাক লোড করা, সেগুলোকে এক সারিতে রাখা, খালি কাভার্ড ভ্যানকে অন্য পাশে রাখা, গাড়ির সারি চারটার পরিবর্তে তিনটি করা, ফুটবারী দিয়ে পানি প্রবেশ করা, মাঝ নদীতে ইঞ্জিন বন্ধ হওয়া ও ঘাটে এসে সজোরে ধাক্কা লাগাসহ একাধিক কারণে ডুবে যায় শাহ আমানত নামের ফেরিটি।