‘গণসংহতি আন্দোলন’-এর চতুর্থ জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন, গতকাল শুক্রবার আয়োজনটা ছিল জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে। হাজার খানেক নেতাকর্মী এই সম্মেলন মঞ্চ থেকে সরকার পতনে ‘গণঅভ্যুত্থান’-এর ডাক দিলেন সরকারবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা। ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ চাই’ স্লোগানে এই সম্মেলন থেকে ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে
যারা যার অবস্থান থেকে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আমি ভরসা পাচ্ছি, রাজপথ দখলে নিতে হবে: ড. কামাল
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে গণফোরাম সভাপতি ও দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আমি ভরসা পাচ্ছি, মানুষের ঐক্য হচ্ছে, ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। জনগণ আন্দোলনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। ডাক দিলেই রাজপথে নেমে আসতে হবে। অবিলম্বে রাজপথে নামতে হবে। ইতোমধ্যে নামা শুরু হয়ে গেছে। রাজপথ আমাদের দখল করতে হবে।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। কিন্তু তারা ক্ষমতা ভোগ করে যাচ্ছে। দেশে ষোলআনা স্বৈরাচার বিরাজ করছে। কোনো কিছুই জনগণের নিয়ন্ত্রণে নেই। অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে নেই, দেশের শাসনতন্ত্র জনগণের নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি আরো বলেন, দেশে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এই সরকার থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। সারা দেশের রাজপথ যখন দখলে আসবে, তখন দেশে মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।
একত্রে রাস্তায় নামলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী:
জাফরুল্লাহ চৌধুরী
সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি তার বক্তব্যে ড. কামালকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার কাছে আবেদন, সবাইকে মাফ করে দিয়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে থাকবেন। রাজপথে থেকে অগণতান্ত্রিক এই সরকারকে আমরাই প্রতিহত করতে পারি। একত্রে রাস্তায় নামলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।’
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের ওপর চেপে বসেছে। এখন রোহিঙ্গাদের আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে, প্রয়োজনে অস্ত্র দিতে হবে, মদত দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের আরাকান দখলে নিতে পারে।
ভোটাধিকার আদায়ে ভয়কে জয় করতে হবে: মান্না
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় আছে তারা মানুষই না। তারা মিথ্যা বলে, বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলে। এরা সবাই ডাকাত। ভয়কে জয় করে ভোটাধিকার আদায়ের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।’
সম্মিলিত গণজোয়ারের মাধ্যমে অভ্যুত্থান একমাত্র সমাধান: জোনায়েদ সাকি
সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে এই সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। আসুন, লড়াই করে, অভ্যুত্থান করে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাই। সম্মিলিত গণজোয়ারের মাধ্যমে অভ্যুত্থান একমাত্র সমাধান।
তিনি বলেন, যে দেশে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তারচেয়ে বড় জবরদস্তি হতে পারে না। সম্মেলনে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে যুক্ত হতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন।
জানি না, কোথায়, কখন আগুন লেগে যাবে : সাইফুল হক
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের ধর্মাশ্রয়ী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। শব্দ হলে মনে করে বোমা ফুটছে, এই হচ্ছে সরকারের সাহসের নমুনা।’ তিনি বলেন, জানি না, কোথায়, কখন আগুন লেগে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক ব্যবসা আর চলছে না, তাই তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ব্যবসা শুরু করেছে।
অন্যরা যা বললেন
সম্মেলনে ‘ভাসানি অনুসারী পরিষদ’-এর মহাসচিব রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতিতে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য আমরা একটা প্ল্যাটফরম তৈরি করব। গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্রচিন্তা, ভাসানি অনুসারী পরিষদ মিলে একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করা হবে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সংবিধানের বিপরীতে গিয়ে দেশ পরিচালনা করছে ক্ষমতাসীন দল। এই সরকার লুটেরা, ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার সরকার।
গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা মনির উদ্দিন পাপ্পুর সঞ্চালনায় সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন—‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনে’র প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ। উদ্বোধনী অধিবেশনের পর শোভাযাত্রা করে মত্স্য ভবন মোড় ঘুরে আবার প্রেসক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়।
আমন্ত্রণ পাননি নুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরকে সঙ্গে নিয়ে কিছুদিন আগ পর্যন্ত যৌথভাবে নানা সভা-সমাবেশ করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। ঐসব কর্মসূচিতে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়াও থাকতেন। নুরের আগের মূল সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র-যুব-শ্রমিক অধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানি অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্রচিন্তা—এই চারটি সংগঠন পৃথক একটি মোর্চাও গঠন করেছিল। গত ২৬ অক্টোবর রেজা কিবরিয়া ও নুরের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ ঘটে নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ গণ-অধিকার পরিষদে’র। এরপর থেকেই নুর ও সাকি পৃথকভাবে পথ হাঁটছেন। সাকি তার দলের সম্মেলনে রেজা কিবরিয়া ও নুরকে আমন্ত্রণ জানাননি।
