বিশ্ব ইজতেমা ও বাংলাদেশ

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৩

 ‘এ্যাই মুসলমানা তুম মুসলমান বনো’ (হে মুসলিম ভাইয়েরা তোমরা সত্যিকার মুসলমান হও)। তত্কালীন ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী দিল্লীর দক্ষিণাপার্শ্বস্থ এলাকা হরিয়ানার ‘মেওয়াত’ অধিবাসী ধর্ম-কর্মহীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলমানদের সম্মোধন করে এ কথাগুলো বলেছিলেন আজকের বিশ্বব্যাপী সমাদৃত তাবলিগ জামাতের সার্থক রূপকার হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ)। ১৯১০ সালে ভারতের এক জনবিরল অঞ্চল ‘মেওয়াত’ হতে দাওয়াত ও তাবলিগের এই মেহনত শুরু হয় যা এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই দাওয়াত ও তাবলিগ হলো একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ব্যাপক ও গতিশীল একটি ইসলামী আন্দোলন। ইসলামী চিন্তা-চেতনায় বিশ্বজুড়ে সমাদৃত একটি নীরব বিপ্লব। 

হযরত ইলিয়াস (রহ) ১৩৫১ হিজরি সালে হজ থেকে ফিরে আসার পর সাধারণ মুসলমানদের দুনিয়া ও সংসারের ঝামেলা থেকে মুক্ত করে ছোট ছোট দলবদ্ধ করে, মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশে অল্প সময়ের জন্য দীনি শিক্ষা দিতে থাকেন। এরই মাঝে একদা তিনি হুজুরে আকরাম (স) কে স্বপ্নে দেখেন এবং মহানবী (স) তাকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের জন্য নির্দেশ দেন। মহানবী (স) এর নির্দেশ মোতাবেক তিনি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজের সূচনা করেন। তারপর এ কাজকে আরো বেগবান ও গতিশীল করার জন্য এ উপমহাদেশের সর্বস্তরের আলেম ওলামা, পীর মাশায়েখ ও বুজুর্গানদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করা হয় এবং দিল্লীর নিকটস্থ মেওয়াতে সবস্তরের মুসলমানের জন্য ইজতেমা বা সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ক্রমেই তাবলিগের কার্যক্রম বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের আনাচে-কানাচে। হযরত মাওলানা আবদুল আজীজ (রহ) এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে বাংলাদেশে তাবলিগের মেহনত শুরু হয়। তারপর ১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের তাবলিগের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে। পরে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা শুরু হয়। এর পরে ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের  সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে এবং সর্বশেষে ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। এক পর্যায়ে দেশি-বিদেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থান সংকুলানের অভাবে প্রাগৈতিহাসিক ও ‘কহর দরিয়া’ খ্যাত বর্তমান তুরাগ নদীর তীরে ১৯৬৭ সালে বিশ্ব ইজতেমা স্থানান্তর করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি প্রতিবছর এখানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত ‘বিশ্ব ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রশস্ত জায়গা-জমি পেলেও অস্থায়ী হওয়ার কারণে নানা সমস্যায় তাদেরকে এই ইজতেমা করতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৬০ একর জায়গা স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দিলে স্বাধীন ও সুশৃঙ্খলভাবে ইজতেমা আয়োজনে সুবিধা হয়।

বিশ্ব ইজতেমা শুধু তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম বৃদ্ধি ও ইসলামের প্রসার-প্রচারের ক্ষেত্রে নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় তথা বৃহত্তর মুসলিম সম্প্রদায়ের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দিন দিন মানুষ তাবলিগমুখী হচ্ছে। ফলে বিশ্ব ইজতেমার কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে যেমন, তেমনি সামগ্রিক একটি প্রভাব আমাদের জীবনে রেখে যাচ্ছে। বিশাল এক ইসলামী সম্মেলন হিসেবে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি ও ধর্মীয় ভাবমূর্তি গঠনেও বিরাট ভূমিকা রাখছে।n