মো. শামীম আখতার, মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা
মিঠাপুকুরের বলদীপুকুর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীপাড়ার বাসিন্দা কার্মিলা মিনজি (৫০)। প্রতিবন্ধী স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। বড় মেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় শেষ করেছে। মেজো মেয়ে স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণি ও ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। গোটা পরিবারের ভরণ-পোষণ সবকিছু কার্মিলা মিনজির শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষিশ্রম দিয়েও অভাব-অনটন পিছু ছাড়ছে না তার। বছরের বেশির ভাগ সময় কাজ পান না কার্মিলা মিনজি। তখন স্বল্প মূল্যে শ্রম দিতে হয় স্থানীয় কৃষি কাজে। এছাড়াও, রয়েছে পুরুষের তুলনায় নারীদের শ্রমের মূল্যের ফারাক। এমন পরিস্থিতি শুধু কার্মিলা মিনজিরই নয়। ঐ এলাকায় সব নৃগোষ্ঠী নারী শ্রমিকদের দশা প্রায় একই।
উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের বলদীপুকুর এলাকায় প্রায় হাজার দুয়েক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। কৃষিকাজ ও শ্রম দিয়ে চলে তাদের সংসার। বুধবার বিকালে সরজমিনে বলদীপুকুর মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একটি সবজিখেতে কাজ করছিলেন ১২ জন নৃগোষ্ঠীর নারী শ্রমিক। এ সময় কথা হয় বলদীপুকুর মিস্ত্রিপাড়ার ভারতী কুজুরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামার জমি নাই। মানুষের জমিত কাজ করি খাই। এখন মজুরির দাম নাই। বিকালে এই ক্ষ্যাতোত আসছি, ঘণ্টায় ২০ ট্যাকা (টাকা) ধরি তিন ঘণ্টায় ৬০ ট্যাকা পাম।’ আরেক জন নৃগোষ্ঠী নারী শ্রমিক সূচিত্রা খালকো বলেন, ‘হামার মজুরির দাম নাই। পুরুষ ৪০০-৫০০ ট্যাকা হইলে, হামার ২০০-২৫০ ট্যাকা। হামরা নারী হওয়ার কারণে দাম কম।’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা এখন বেশির ভাগ সময় স্বল্প মূল্যে খণ্ডকালীন কাজ করছেন। ঝর্ণা লাকড়া তাদের মধ্যে এক জন। তিনি বলেন, পুরুষের তুলনায় নারীদের মজুরি কম।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মিঠাপুকুরের ১৭ ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৮৯৭ জন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোকজন বাস করছে। এর মধ্যে রাণীপুকুর, দুর্গাপুর ও বড় হযরতপুর ইউনিয়নে তাদের সংখ্যা বেশি। মিঠাপুকুর উপজেলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি মোহন লাল কুজুর বলেন, কৃষি উন্নয়নে অবদান বাড়ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীদের। কৃষি-বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালায় তাদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানসহ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, নারী শ্রমিকরা মজুরির মূল্য কম পান শুনেছি। মূলত নারী শ্রমিকরা অল্প টাকায় কাজ করতে রাজি হয়ে যান। এ সুযোগটাই কাজে লাগান গ্রোয়ার্সরা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারী শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, তাদের (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ৫০টি ঘর দেওয়া হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করছে সরকার। এছাড়াও, নানাবিধ সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। পুরুষের তুলনায় নৃগোষ্ঠী নারী শ্রমিকদের কম মূল্য পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নারী-পুরুষ সমান মূল্য পাওয়ার কথা। নারীদের শ্রমের মূল্য কম, বিষয়টি আমার জানা নেই।’
