কালিমার দাওয়াত ও মেহনত

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৫

আমল ঠিক হয়ে গেলেই মানুষের জীবন সুন্দর হয়ে যায়। আমল ঠিক হয় কলব-অন্তর ঠিক হওয়ার দ্বারা। এ কারণেই নবীগণ মানুষের কলব ঠিক করার উপর অধিক হারে মেহনত করেছেন। এই অন্তর বা কলবের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ। শুধু তাই নয় বরং আলম তথা জগতের দৃশ্য ও অদৃশ্য সবই তাঁর সৃষ্ট। এতসব সৃজনে তাঁর কোনো আসবাব-উপকরণের প্রয়োজন হয়নি। তিনি ইচ্ছে করলেই বানাতে পারেন। ইচ্ছে হলে আসবাবের মাধ্যমে বানান আবার ইচ্ছা হলে আসবাব ছাড়াও বানান। কিছু তৈরি করতে তিনি কোনো কিছুর বা কারো মুখাপেক্ষী নন। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম (আ) কে মা-বাবা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। আর তার পাজর থেকে সৃষ্টি করেছেন মা হাওয়া (আ) কে। হযরত যাকারিয়া (আ) কে ১২০ বছর বয়সে সন্তান দান করেছেন। আর তা এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, এই সংবাদ শোনা মাত্রই তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন- আমার চুলগুলো পেকে গেছে অথচ আপনি বলছেন- তুমি পিতা হবে! হযরত মারইয়াম (আ) থেকে পিতা ছাড়াই নবী ঈসা (আ) এর জন্ম দিয়েছেন। আবার ঈসা (আ) মায়ের কোলে থেকেই মায়ের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কথা বলেছেন।

মুহতারাম ভাই, দোস্ত ও বুযুর্গ! আল্লাহর হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান মেনে চললে, তিনি বান্দাকে যাবতীয় বালা-মসিবত থেকে মুক্তি দান করেন। হযরত ইবরাহীম (আ)কে নমরুদের তৈরি অগ্নিকুণ্ড থেকে এবং হযরত মুসা (আ) কে ফেরাউনের কবল থেকে আল্লাহ মুক্তি দান করেন। তিনি চাইলে যে কোনো সময় যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন। বাধা দেওয়ার বা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কারো নেই।

মুহতারাম ভাই ও দোস্ত! মুহাম্মাদ (স) এর উম্মত শেষ উম্মত হওয়া সত্ত্বেও সবার আগে জান্নাতে যাবে। কারণ আগেকার নবীগণ স্বীয় উম্মতকে ঈমানের পর আমল শিক্ষা দিয়েছেন। আর আমাদের প্রিয় নবী (স) আপন উম্মতকে ঈমান আনার পর অন্যকে ঈমান আনার তা’লীম দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন। নবীজী (স) দীর্ঘ ১৩ বছর শুধু দাওয়াতের কাজেই ব্যয় করেছেন এবং নিজের সাথী-সঙ্গীদেরকেও তাতে শরিক রেখেছেন। যে কেউ তার কাছে এসে ঈমান আনার পর তিনি তাকে বলতেন- তুমি আপন গোত্রের কাছে ফিরে যাও এবং তাদেরকে ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এই কালিমার প্রতি ডাকো। এই কালিমার দাওয়াত দাও।

দীনকে কায়েম ও দায়েম রাখার জন্য অনেক কোরবানির প্রয়োজন। কোরবানিই হলো এ উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হযরত ইবরাহীম (আ) নিজের কলজে ছেঁড়া ধন ইসমাঈল (আ) কে দীনের জন্য কোরবানি করেছিলেন। সেই কোরবানির বদৌলতে এবং হযরত ইবরাহীম (আ) এর বরকতময় দু’আর কারণে আরবের মরুভূমিতে আগমন করেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)। রাসূলুল্লাহ (স) তিনিও জীবনে অনেক অনেক কোরবানি করেছেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকেও দীনের জন্য আত্মোত্সর্গ করা শিখিয়েছেন।  নারী, পুরুষ, ছোট, বড়, সবাই ক্ষুধা, পিপাসা, অভাব-অনটন, নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করে দীনের দাওয়াতের কাজ তারা অবিরাম চালিয়ে গিয়েছেন।

মুহতারাম দায়ীবৃন্দ! বিদায় হজের ভাষণ আমাদের জন্য একটা গাইড লাইন। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (স) বললেন- ‘তোমরা যারা এখানে হাজির আছ, তারা তোমাদের অনুপস্থিত ভাইদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিও।’ এই ঘোষণা দেওয়ার পর হজ করতে আসা সোয়ালাখ সাহাবাদের থেকে মাত্র কয়েক হাজার সাহাবা মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে গিয়েছিলেন। বাকী সবাই দীনের দাওয়াত নিয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। নবী কারীম (স) ও সাহাবায়ে কেরামের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার দরুন মাত্র পঁচিশ বছরে পুরা জাযিরাতুল আরবে ইসলাম ধর্ম বিস্তার, প্রচার ও প্রসার লাভ করে। আর হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা) এর খেলাফত কালে দীনের প্রভাব মানব জাতি ছাড়িয়ে জিন ও অন্যান্য জীব-জন্তুদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত উমরের মৃত্যুর পর আমি জিনদের কাঁদতে শুনেছি। তাই দুনিয়ার বুকে দীনকে কায়েম ও দায়েম করার লক্ষ্যে নিজের সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে, কোরবানি করে আমাদেরকে আরো বেশি মেহনতী হতে হবে। (গত বছর ১২/০১/১৮ তারিখ, শুক্রবার বাদ ফজর বিশ্ব ইজতেমায় প্রথমবারের মতো আরবি ভাষায় প্রদত্ত বয়ানের সার-সংক্ষেপ। অনুবাদ:মাওলানা হারুনুর রশীদ খান)।