সুন্দরবনের ছোট ছোট খালে নৌকায় ঘোরার সময় চোখ চলে যাবে দুইধারের সুন্দরী, গোলপাতা, কেওড়া, গড়ানসহ ইত্যাদি গাছের দিকে। এসব চিরসবুজ গাছের ডালপালা ও পাতার মাঝ থেকে ভেসে আসা পাখির কলকাকলি যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। গহিন সুন্দরবনের সৌন্দর্যে ডুবে গিয়ে খাল ধরে চলতে চলতে এক পর্যায়ে ভাটা শুরু হলো। খালের দুই ধারের পানি সরে কাদামাটি সূর্যের আলোতে চিকচিক করতে লাগল। হঠাত্ চোখে পড়ল কাদামাটিতে ছুটে বেড়াচ্ছে চিড়িং মাছ। বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ও জোয়ারভাটার ফলে তৈরি জলাশয়ে গেলেই দেখা মেলে কাদামাটিতে তিড়িংবিড়িং করে লাফালাফিতে ব্যস্ত চিড়িং মাছের দল। কাছে গেলেই দ্রুত লাফিয়ে পানিতে চলে যায়। অঞ্চলভেদে চিড়িং ‘ডাকুর’ বা ‘ডাকার’ নামেও পরিচিত। মূলত প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের জলাশয়ে প্রায় ৩৪ প্রজাতির চিড়িং মাছ পাওয়া যায়। এই উভচর মাছ তার বুকের নিচের পাখনার সাহায্যে মাটিতে চলাচল করতে পারে। যে এলাকা জোয়ারের সময় পানির নিচে এবং ভাটার সময় পানির ওপরে থাকে সেখানে এই মাছ থাকতে ভীষণ অভ্যস্ত। চিড়িং মাছ এই পরিবেশে টিকে থাকার জন্য নিজের অভিযোজন ঘটিয়েছে। জলাশয়ের বাইরে এরা নিজেদের অঞ্চল রক্ষা, খাদ্য গ্রহণসহ বিভিন্ন কাজে সক্রিয় থাকে। চিড়িং মাছ বিভিন্ন লবণাক্ততার গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, উপক্রান্তীয় জলাশয়, মোহনা এবং ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে বাস করে। উভচর মাছ চিড়িং সম্পর্কে কিছু তথ্য—
লাফালাফিতে ওস্তাদ চিড়িং একলাফে ২.৭৫ থেকে ৯.৭৫ ইঞ্চি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
অধিকাংশ চিড়িংই সাধারণত জলপাই-বাদামি রঙের হয়। তবে বেশকিছু প্রজাতি নীল রঙের হয়ে থাকে।
চিড়িং মাছ অনেকটা ব্যাঙ বা ব্যাঙাচির মতো। এর রয়েছে প্রসারিত চোখ, টর্পেডো-আকৃতির শরীর, বুকের দিকে পেশিবহুল এবং পিঠের দিকে দুটি পাখনা।
চিড়িং মাছের চোখ স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে পারে। ফলে তারা একই সময়ে পানির ওপরে ও নিচের দিকের বস্তু দেখতে পারে।
চিড়িং মাছ মাংসাশী, তাই এর প্রধান খাদ্য পোকামাকড়, ক্রাস্টেসিয়ান, ছোট মাছ এবং ক্রিমি।
ভাটার সময় শক্ত মাটিতে চিড়িং মাছ টিকে থাকতে সক্ষম। এটি ফুলকা, গলা ও মুখের শ্লেষ্মা ঝিল্লি এবং ত্বকের ঘন কৈশিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শ্বাস নেয়।
চিড়িং মাছের ফুলকার আকার অনেক বড় হওয়ায় তা প্রচুর বাতাস ধারণ করতে পারে এবং জলাশয়ের বাইরে দৃঢ়ভাবে বন্ধ থেকে মাছকে জলাশয়ের বাইরেও টিকে থাকতে সাহায্য করে। চিড়িং মাছ দেহগহ্বরে একটি বায়ুথলির ব্যবস্থা রাখে, যা দেহ দূষিত পানিতে নিমজ্জিত হলেও স্বল্প অক্সিজেন ঘনত্বেও শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য চিড়িং মাছ নরম মাটির স্তরে গর্ত তৈরি করে বসবাস করে এবং এই গর্তেই ডিম দেয়।
চিড়িং বেশি সময় পানিতে থাকলে মারা যায়। তাই বেঁচে থাকার জন্য এটি পানি থেকে লাফ দিয়ে জলাশয়ের পাশের মাটিতে থাকা গাছের শিকড়, পাথরের পাশে এসে বিশ্রাম নেয়। দৈহিক ও আচরণিক অভিযোজন তাদের জলজ এবং স্থলজ উভয় পরিবেশে গমনে সাহায্য করে। পেশিবহুল দেহের সাহায্যে এরা নিজেদের ভূমি থেকে ২ ফুট উচ্চতায় ওঠাতে পারে।
চিড়িং প্রজাতিভেদে ৫-৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
