একটা সময় ছিল, যখন বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিন ছিল। উত্সবমুখর আমেজে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল উত্সাহ ও উদ্দীপনা ছিল। সিনেমার প্রতি আমোদপ্রিয় বাঙালির হূদয়ে অসীম ভালোবাসা ছিল, যা কালের বিবর্তনে হয়েছে ম্লান। সেই সময়ের হলভর্তি দর্শক আজ নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। চলচ্চিত্রের দুর্দশায় দেশের বহু সিনেমা হল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকে ১ হাজার ২০০-এর কাছাকাছি থাকা হলের সংখ্যা আজ নেমে এসেছে মাত্র ১০০তে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানসম্পন্ন সিনেমা নির্মিত হচ্ছে না বলেই এই দর্শকবিমুখতা।
সিনেমা বা চলচ্চিত্র হচ্ছে সমাজ ও মানবজীবনের দর্পণ। চলচ্চিত্রে মানুষের সংগ্রামের বাস্তব কাহিনি প্রদর্শিত হয়। সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। এর মাঝে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। চলচ্চিত্র রুচিহীন, অবাস্তব ও ভঙ্গুর কাহিনিতে নির্মিত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে আকর্ষণ করবে না। আজও মানুষ গুনগুন করে নব্বইয়ের দশকের সিনেমার গানগুলো গায়, অথচ বর্তমানে হলগুলোতে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর খোঁজ রাখে না। ১৯৮৯ সালে তোজাম্মেল হক বকুল নির্মিত ‘বেদের মেয়ে জ্যোত্স্না’ ২০ কোটি টাকা আয় করে এখনো বক্স অফিসে অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি। এরপর এই ৩২ বছরে কত শত সিনেমা নির্মিত হয়েছে, কেউ সেই রেকর্ড ভাঙতেই পারেনি। এ থেকেই বোঝা যায়, বর্তমানের বাংলা ছায়াছবিগুলো আর আগের মতো তেমন দর্শকনন্দিত হতে পারেনি। চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর গল্প। গতানুগতিক একই ধারায় শুধু প্রেম বা ভালোবাসার কাহিনির ওপর নির্ভর করে চলচ্চিত্র বানিয়ে দর্শকের মনে ঠাঁই করে নেওয়া দুরূহ কাজ। প্রেম ছাড়াও রহস্য, রোমাঞ্চ ও থ্রিলার কাহিনি দর্শককে বহুগুণে বিমোহিত করে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ গল্প মৌলিক নয়, কাহিনি অন্যের থেকে ধার বা নকল করা। সাহিত্যনির্ভর শক্তিশালী গল্প একটি আদর্শ সিনেমা নির্মাণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য থেকে দূরে সরে এসে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের গল্প নির্বাচনে আরো অধিক মনোযোগী হওয়া উচিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিল্পীর অভিনয় দক্ষতা। শিল্পী তার অভিনয় দক্ষতায় ক্যারেক্টার রূপায়ণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে জীবন্ত করে তোলেন। বর্তমানে আর আগের মতো দক্ষ শিল্পী বের হয়ে আসছে না। অভিনয়ের মাধ্যমে যখন শিল্পী ক্যারেক্টারের মধ্যে ঢুকে যান, তখনই তা দর্শকের মন কাড়ে। দেশে অনেক প্রতিভাবান শিল্পী রয়েছেন, যারা থিয়েটারে কাজ করছেন। কঠোর পরিশ্রম করছেন। সুযোগের অভাবে কাজ পাচ্ছেন না। শুধু পরিচিতদের প্রাধান্য না দিয়ে তাদেরও কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে দর্শকের রুচিও বদলেছে। হাতের মুঠোফোনেই জানা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সিনেমার হালচাল। উন্নত প্রযুক্তি ও ক্যামেরার বহুমাত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট ডিজিটাল দৃশ্যায়নে নির্মিত চলচ্চিত্র দর্শককে সহজেই আকৃষ্ট করে। ফলে দর্শকের চাহিদা বা প্রত্যাশাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক দশকে ‘টেলিভিশন’, ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘দেবী’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর মতো ভালো ও ব্যবসাসফল কিছু সিনেমা নির্মিত হলেও তা বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তবে এসব নির্মাণ নতুন করে আশা জাগাচ্ছে। নিয়মিত এমন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মিত হলে দর্শক আবার হলমুখী হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আবার বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে কলরব হবে। মানুষ হুমড়ি খেয়ে আবার টিকিট কিনবে। শো চলাকালীন সিনেমা হলগুলোর সামনে হাউজ ফুল লেখা টানানো থাকবে। শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে রূপালি পর্দার ঝলমলে আলোয় আবার সোনালি দিন ফিরে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা। এজন্য নির্মাণকাজে উন্নত প্রযুক্ত ব্যবহারের পাশাপাশি পুরোনো ধাঁচের তৈরি হলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে। যেন ভালো পরিবেশে মানুষ পরিবার নিয়ে শান্তিতে বসে সিনেমা দেখতে পারে। সিনেমা হলগুলোর খারাপ পরিবেশের কারণে অনেকেই হলে যেতে চান না। প্রতি বছর যেন ভালো নির্মাণকাজ হয়, এজন্য সরকারিভাবে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। একসময় আবদুল জব্বার খান, জহির রায়হান, শিবলি সাদিকের মতো মেধাবী নির্মাতারা কালজয়ী সব সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তারই উত্তরসূরি হিসেবে এই প্রজন্মের নির্মাতাদের শক্ত হাতে বাংলা চলচ্চিত্রের হাল ধরতে হবে। তবেই বাংলা চলচ্চিত্র আলোর মুখ দেখবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।
