ইসলামে সন্তানের মৃত্যুতে সমবেদনা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:৫২

সন্তান আল্লাহর তায়ালার পক্ষ থেকে পিতামাতার  জন্য বিশেষ এক নিয়ামত। আল্লাহ যাকে খুশি তাকে সন্তান দান করেন। যাকে ইচ্ছা সন্তান দান করেন না। সন্তান যাদের নেই তারা বোঝেন সন্তান পরিবারের জন্য কতটা প্রয়োজন। প্রকৃতির স্বাভাবিক রীতি, সন্তান পিতামাতাকে কবরে শুইয়ে দেবে। অথচ পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ! পৃথিবীতে এর চেয়ে ভারী বোঝা কি আর কিছু হতে পারে? স্বয়ং বিশ্বনবী (স) বারবার সন্তান হারানোর বেদনায় শোকাতুর হয়েছেন। তিনি (স) জীবদ্দশায়ই তাঁর সব সন্তানের মৃত্যু দেখেছেন, শুধু বেঁচে ছিলেন ফাতিমা (রা)। সন্তান-সন্ততি প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য ও সুখ-শান্তির বাহন ও উপাদান’ (কাহাফ: ৪৬)। নবদম্পতি বংশের প্রদীপ জ্বেলে দেওয়ার মায়াবী স্বপ্ন বোনে এবং তাদের মুনাজাত থাকে- ‘তুমি আমাদেরকে এমন পরিজন (স্ত্রী-সন্তান) দান করো- যারা আমাদের চক্ষুর শীতলতা দানকারী হবে’ (ফুরকান:৭৪)।

সন্তানের মৃত্যু, মহান আল্লাহ্র বিশেষ পরীক্ষা। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো: ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবনের ক্ষতি ও ফল-ফসল নষ্ট করে...। নিঃসন্দেহে আমরা আল্লাহ্র জন্য এবং আমরা আল্লাহ্র দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’ (বাকারা: ১৫৫, ১৫৬)। প্রিয়নবী (স) বলেন, ‘মু’মিন পুরুষ ও নারীর জান, সন্তান-সন্ততি ও ধন সম্পদ (বিপদ-আপদে) পরীক্ষিত হতে থাকে’ (তিরমিযি)। এছাড়া এক হাদিসে আছে, ‘‘যখন কারো সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ্ ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন, ‘তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবজ করে ফেলেছ?’ তারা বলে- ‘হ্যাঁ’। আল্লাহ্ আবার বলেন, ‘তোমরা তার কলিজার টুকরার জান কবজ করে ফেলেছ?’ তারা বলে- ‘হ্যাঁ’। আল্লাহ্ বলেন, ‘আমার বান্দা কী বলেছে?’ তারা বলে, ‘আপনার বান্দা এই বিপদে ধৈর্যধারণ করে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে’। তখন আল্লাহ্ বলেন, ‘তোমরা আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করো এবং তার নামকরণ করো বাইতুল হাম্দ অর্থাত্ প্রশংসা গৃহ’’ (তিরমিযি)।

সন্তান মৃত্যুর শোক পিতামাতার জন্য বড় কষ্টের। সন্তানের মৃত্যুতে ব্যথিত হয় পিতা-মাতার হূদয়। চোখে দেখা যায় বেদনার অশ্রু। নিজ সন্তানকে প্রতিটি পিতামাতাই ভালোবাসেন। মৃত্যুবরণ করা ভালোবাসার এই সন্তানটি জান্নাতের দরজায় পিতামাতার জন্য অপেক্ষা করবে বলে হাদিস শরীফে উল্লেখ রয়েছে। হজরত মুয়াবিয়া (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রসুল (স)-এর নিকট একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় আসতেন। রসুল (স) তাকে বললেন, তুমি কি ছেলেকে বেশি ভালোবাস? সে উত্তরে বলল, হে রসুল (স) আমি তাকে যেভাবে ভালোবাসি আপনাকেও আমি আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি। কয়েক দিন পর সাহাবীর সাথে ছেলেটিকে দেখতে না পেয়ে আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মাদ (স) বললেন, ঐ ব্যক্তির ছেলেটির কী হলো, তাকে দেখি না কেন? উপস্থিত সাহাবীরা বললেন, ছেলেটি মৃত্যুবরণ করছে। পরবর্তীতে  একদিন ছেলেটির বাবাকে আল্লাহর নবী  (স) তার সন্তানের ব্যাপারে বললেন, তুমি কি সন্তুষ্টি নও যে, তোমার সন্তানটি জান্নাতের কোনো এক দরজায় তোমাদের জন্য অপেক্ষা করুক? অন্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসুল (স) এটা কি তার একার জন্য প্রযোজ্য নাকি আমাদের সকলের জন্য? উত্তরে রসুল (স) বললেন, তোমাদের সকলের জন্য প্রযোজ্য।’(আদদুররুল মানসুর:১/১৫৮)

হজরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (স)-কে বলতে শুনেছি যে, (মৃত্যুবরণকারী) মুসলিম সন্তানেরা জান্নাতের শিশু খাদেম হবে। তাদের পিতা-মাতা কাউকে পেলে তার কাপড় টেনে জান্নাতে না নেওয়া পর্যন্ত  ছাড়বে না।’ (মুসলিম, মিশকাত-১৭৫২)

ইবনু মাসউদ (রা) বর্ণিত এক হাদিসে আছে, রাসুল (স) বলেন, ‘তোমরা কাকে নিঃসন্তান মনে করো?’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘যার সন্তান হয়নি আমরা তাকেই নিঃসন্তান মনে করি’। তিনি (স) বলেন, ‘সে ব্যক্তি নিঃসন্তান নয়। বরং সে ব্যক্তিই নিঃসন্তান, যে তার কোনো সন্তান আগে পাঠায়নি (অর্থাত্ যার জীবদ্দশায় তার সন্তান মৃত্যুবরণ করেনি)’ (মুসলিম)।

আল-কুরআনের বাণী: ‘কুল্লু নাফিসন যায়িকাতুল মাউত’—সবাইকে মরণের স্বাদ আস্বাদন করতেই হবে (আল—ইমরান: ১৮৫)। আর দারুণ কষ্টের বিষয় হলো সন্তানের মৃত্যু: ‘আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে/ দ্বীন-দুনিয়ার ভেস্ত আমার ঘুমায় কিসের ছলে...’ (কবর, কবি জসিম উদ্দীন)। বস্তুত পিতামাতার জন্য প্রতিটি সন্তান আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত আমানত স্বরূপ। এই আমনত তিনি যে কোনো সময় নিয়ে নিতে পারেন। তাই সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ করাই শ্রেয়।

lলেখকদ্বয়:যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর এবং খতিব ও ইসলামি গবেষক