হিমালয়ের ভয়াবহ পরিণতি কি সন্নিকটে?

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৪১

হিমের আলয়—‘হিমালয়’ কি দূর ভবিষ্যতে নামপরিবর্তন করিবে? জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নূতন একটি গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হইয়াছে যে, ২১০০ সাল নাগাদ হিমালয়ের হিমবাহের অর্ধেক গলিয়া নিঃশেষ হইয়া যাইবে। হিমালয়ের পাশাপাশি হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহের পরিণতিও ভালো নহে। ইহার কারণ বিশ্বের উষ্ণায়ন। এই মাসের শুরুতে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরিতে নিযুক্ত ছিলেন বিশ্বের ২১০ জন বিজ্ঞানী। নেতৃত্ব দিয়াছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) গবেষক ফিলিপাস ওয়েস্টার। তাহার মতে, হিমালয়ের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ১৬৫ কোটি মানুষের জীবন। হিমালয়ের কিছু অংশের গলনে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ আকার ধারণ করিবে। প্রথমে প্রবল বন্যা, তাহার পর অন্তহীন খরা—পুরা হিমালয়ের প্রভাববলয়ে থাকা মানুষের জীবনের ভবিতব্য নাকি এমনটিই হইতে যাইতেছে!

তবে এই দশকের শুরুতে ‘হিমালয়ের হিমবাহগুলি দ্রুত গলিতেছে’—এমন প্রতিবেদনের সত্যতা লইয়া তোলপাড় হইয়াছিল। তখন বলা হইয়াছিল যে, এতদঞ্চলের হিমবাহগুলি গলিয়া যাইবার মাত্রা এতখানিই দ্রুত যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে তাহা নিঃশেষ হইয়া যাইবে। জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এই তথ্য জানাইয়াছিল। কিন্তু পরবর্তীসময়ে বলা হইয়াছিল ওই প্রতিবেদনটি ছিল ‘একটি দুঃখজনক ভুল’। হিমালয় পর্বত কেবল ১৬৫ কোটি মানুষের জীবনের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখে না, ইহা পৃথিবীর দুই মেরুর বাহিরে বরফের সবচাইতে বড় উত্স। বিশুদ্ধ পানির বিপুল মজুদের কারণেই বিশ্বের উচ্চতম পর্বত শ্রেণিটিকে বলা হয় ‘তৃতীয় মেরু’। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটান—এই ছয়টি দেশের প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ছড়াইয়া থাকা হিমালয়ের মজুদ বরফ হইতে জন্ম লইয়াছে অসংখ্য ছোট-বড় জলপ্রবাহ। এমন একাধিক প্রবাহ মিলিয়াই তৈরি হইয়াছে অসংখ্য নদী। এশিয়ার প্রধান পাঁচটি নদীধারা সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও ইরাবতির উত্স হইতেছে হিমালয় পর্বতমালা। এইসকল ধারার শত শত শাখানদী ও উপনদী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হিমালয়ের উপর নির্ভরশীল। নদী অববাহিকার বসতির কথা ধরিলে পশ্চিমে আফগানিস্তান হইতে পূর্বে মিয়ানমার এবং উত্তরে তিব্বত মালভূমি হইতে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবধি কয়েক শত কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, সেচ, পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি হিমালয়ের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। প্রতিবেদনটির তথ্যানুযায়ী আরো দুশ্চিন্তার কথা হইল, বিশ্বে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করা সম্ভব না হইলে হিমালয়-হিন্দুকুশ হিমবাহের দুই-তৃতীয়াংশ বরফ গলিয়া নিঃশেষ হইয়া যাইতে পারে। এমনকি বিশ্ব যদি এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসেও নামাইয়া আনিতে পারে, তবু অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বরফ গলিয়া নিঃশেষ হইয়া যাইবে!

সত্যিকার অর্থে বিশ্বের কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করা মুখের কথা নহে। আধুনিক সভ্যতার বর্তমান অভিযাত্রা একঅর্থে রুদ্ধ করিয়া দিতে হইবে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করিতে হইলে। তবে উপায় যাহাই হউক, প্রতিবেদনটি সঠিক হইলে হিমালয়কে রক্ষার জন্য বিশ্বকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেই হইবে।