নীল চাষ, নীল কর ইত্যাদি একসময় একটি আতঙ্কের বিষয় ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। ব্রিটিশরা একসময় বাঙালি কৃষকদের নীল চাষ করাতে বাধ্য করত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতক থেকে এতদঞ্চলে নীল চাষের গোড়াপত্তন হয়। কারণ এখানকার মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু নীল চাষের জন্য খুবই উপযোগী ছিল। তখন ব্রিটিশ শাসকচক্র বাংলার কৃষকদের দিয়ে নীল চাষ করিয়ে নিত। কিন্তু এর লাভের বেশিরভাগ নিয়ে যেত বেনিয়ারা। তখন কৃষকগণকে লাভের বদলে দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হতো।
নীল আসলে কী? দীর্ঘদিনের ব্যবধানে এখন হয়তো নীল সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু ভুলে গেছি। নীল হলো আসলে একটি কৃষি ফসল। ই্ংরেজিতে একে বলে ইন্ডিগো (Indigo) এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Indigofera tinctoria. নীলের চাষাবাদ পদ্ধতি খুব সহজ। বাংলাদেশের আবহাওয়া নীল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। যেকোনো ধরনের উঁচু মাটিতেই নীলের আবাদ করা সম্ভব। তবে বেলে মাটি যেখানে অন্য তেমন কোনো ফসল হয় না সেসব স্থানেও নীল চাষ করা সম্ভব। তাছাড়া নীল চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা খুবই সহজ। আবার দেখা যায়—খেতের আইলে, পুকুরের পাড়ে, নদীর ধারে, রাস্তাঘাট ও মাঠের পাশেও বিনা চাষে নীল আবাদ করা যায়।
২০০৬ সাল থেকে রংপুরের কয়েকটি ইউনিয়নে নীল আবাদ হয়ে আসছে যার সফলতার কারণে তা এখন অনেকটাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। লাভবান হচ্ছেন সেসব এলাকার কৃষক। আগেই বলেছি লিগুমিনাস জাতীয় একটি ফসল হওয়ার কারণে এর আবাদের ফলে জমিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কিছু নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে থাকে। এতে সেসব জমিতে ইউরিয়া সারের চাহিদা কম লাগে। তাছাড়া বাড়তি ডালপালা লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অর্থাত্ নীল আবাদে শুধু যে নীলই পাওয়া যায় তাই নয়। এর থেকে উপজাত হিসেবে নাইট্রোজেন, লাকড়ি, বীজ ইত্যাদি পাওয়া যায় যা থেকেও কৃষক সমানভাবে লাভবান হয়ে থাকে।
আমাদের দেশের উত্পাদিত ভালোমানের নীলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের আরো অনেক দেশে। একমাত্র ভারতেই প্রতিবছর নীলের চাহিদা হলো ২৫০ মেট্রিক টন। কাপড়ের মধ্যে রং লাগাতেই এসব নীল বেশি ব্যবহার করা হয়। কারণ হিসেবে জানা গেছে, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে নাকি মানুষের গায়ে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাই প্রাকৃতিক রঙের দিকেই ঝুঁকছে আধুনিক মানুষ। তাছাড়া নীল চাষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ এক সময় উত্তরবঙ্গে যে মঙ্গা নামক অভাব জেঁকে বসত এখন তা আর নেই। সেসবের একটি অন্যতম কারণ হলো জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তাদের হাতে কাজ সৃষ্টি হওয়া। সেসব কাজের অনেকটাই সৃষ্টি করেছে নীল চাষ।
যেহেতু এখন নীল ইউরোপসহ বহির্বিশ্বের অনেক দেশে প্রচুর চাহিদার একটি পণ্য। কাজেই এখন তা দিয়ে একটি মধুর প্রতিশোধও নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ একসময় বাংলার কৃষককে শোষণ করে অর্থ পাচার করত ইংলিশ নীলকরেরা। কিন্তু বৈধভাবেই নীল উত্পাদন করে সেসব দেশে রপ্তানি করে সেখান থেকে নীলের বিনিময়ে বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনই হলো মধুর প্রতিশোধ। কারণ তাদের কাছে এখন যেমন তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। কাজেই একসময় অত্যাচারের মাধ্যমে পাচার করার সম্পদ নীল তাদেরকেই আমাদের দেশ থেকে চরমমূল্যে কিনে নিতে হবে—তা তো সত্যিই একটি মধুর প্রতিশোধ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এভাবেই প্রতিক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তেমনটিই প্রত্যাশা।
লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
