মাটি, পানি, বাতাস কোনোটাই রেহাই পায় না ইটভাটার দূষণ থেকে। ৪২৪.৪৮ বর্গমাইলের নারায়ণগঞ্জে ২৫৪টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। এসব অবৈধ ইটভাটার মধ্যে শুধু সদর আর রূপগঞ্জেই রয়েছে ২১৯টি। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে এসব ইটভাটা। কম উচ্চতার চিমনিতে ইট পোড়ানো হচ্ছে। ধানী জমিতে, নদীর ধারে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ ইটভাটা। ফলে মানুষের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি ইটভাটার আশপাশের ফসল, গাছপালা মরে যাচ্ছে। এসব অবৈধ ইটভাটার কারণে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর, নারায়ণগঞ্জ-এ লোকবল রয়েছে সর্বসাকুল্যে মাত্র ৮ জন। এই ৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে এসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদফতর সাধারণত অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে নোটিস, মামলা কিংবা তাদেরকে জরিমানা করে থাকে। লোকবলের অভাবে সেটিও তারা করতে পারছেন না। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে তারা মাত্র দুবার অভিযান পরিচালনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইপিএ’র সর্বশেষ (২৩ জানুয়ারি, ২০১৯) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সংস্থাটি বিশ্বের ১৮০টি দেশ সামগ্রিকভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় কী ধরনের ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে একটি সূচক তৈরি করেছে। তাতে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প থেকে দেশের আটটি শহরের বায়ুর মান প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের দৈনিক বায়ু মান বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আটটি প্রধান জেলা শহরের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বায়ুর মান খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ুদূষণের অন্যতম উত্স হচ্ছে এসব অবৈধ ইটভাটা।
ইটভাটা সাধারণত এফসিকে, অটো ব্রিকস, জিগজ্যাগ, হাইব্রিড, ফরম্যান, বিএসভিকেসহ বিভিন্ন ধরনের হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, নারায়ণগঞ্জে জিগজ্যাগ পদ্ধতির ছাড়পত্র ও নবায়নবিহীন ইটভাটা রয়েছে ১৫০টি। এর মধ্যে রূপগঞ্জে রয়েছে ৮২টি, সদর উপজেলায় রয়েছে ৩৬টি, বন্দরে ২৫টি, সোনারগাঁয়ে ৭টি। আর ১২০ ফুট চিমনিবিশিষ্ট অবৈধ ইটভাটা রয়েছে ১০৪টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় রয়েছে ৬৯টি, রূপগঞ্জে রয়েছে ৩২টি, আড়াইহাজারে ১টি ও সোনারগাঁয়ে ২টি।
পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলার ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক নয়ন মিয়া জানান, একটি এলাকায় যে কয়টি ইটভাটা থাকার কথা তারচেয়ে অনেক বেশি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। নিয়ম না মেনে কোনো লাইসেন্স কিংবা ছাড়পত্র ছাড়াই অনেক ইটভাটা অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ইটভাটা একটি এলাকায় কতগুলো থাকবে সেটিও আমরা নির্ধারণ করতে পারছি না। ফলে বায়ু দূষণ অনেক বেড়ে গেছে। সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, পিএম ১০, পিএম ২.৫সহ ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের বাতাসে অনেক বেড়ে গেছে। সিভিল সার্জন ডা. এহসানুল হক বলেন, বায়ু দূষণের ফলে জনস্বাস্থ্যের ওপর তাত্ক্ষণিক এবং দীর্ঘ মেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে। হাজার হাজার লোক শ্বাসতন্ত্র, ফুসফুস এবং স্নায়ুতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দূষিত বায়ুর কারণে হূদযন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত দূষিত বায়ু সেবনে গর্ভবতী নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, বায়ু দূষণের কারণে জন্মের আগেও শিশু মারা যেতে পারে। শিশুরাই বায়ু দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া দেহের বিপাক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটা, শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং এলার্জিজনিত সমস্যাও এই বায়ু দূষণের কারণে হয়ে থাকে বলে মনে করা হয়।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সেলিম রেজা বলেন, পরিবেশ দূষণরোধে খুব দ্রুতই এসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আমরা অভিযানে নামবো। আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংকট রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি এ বি সিদ্দিকী বলেন, রাজধানী ঢাকার বায়ু দূষণের জন্য আশপাশের এলাকার ইটভাটাগুলোকে দায়ী করা হয়। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অন্যতম। পরিবেশ সুরক্ষা করেই ইটভাটাগুলোকে ইট পোড়াতে হবে এবং এটি করতে তাদের বাধ্য করতে হবে। নতুবা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে। প্রয়োজনে প্রত্যেক থানায় থানা নির্বাহী অফিসার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিক, সুশীল সমাজের লোকদের নিয়ে পরিবেশ সুরক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে যারা এলাকায় ইটভাটাগুলোর পরিবেশ দূষণরোধে কাজ করবে।
