কম্বোডিয়ায় গণহত্যার ঐতিহাসিক রায়

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৩৬

পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া সমপ্রতি ১৭ লক্ষ মানুষকে হত্যার জন্য দণ্ড দেওয়া হইয়াছে দুইজন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ অবধি চার বত্সরে কম্বোডিয়ায় খেমাররুজের শাসনামলে প্রাণ হারাইয়াছেন ১৭ লক্ষ মানুষ। প্রায় ৪০ বত্সর পর জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনালের বিচারে এই প্রথম ওই গণহত্যায় দোষী সাব্যস্ত হইলেন প্রধান দুই অভিযুক্ত নুওন চিয়া এবং খিউ সাম্ফান। বিরানব্বই বত্সর বয়সী নুওন ছিলেন খেমাররুজ আন্দোলনের নেতা পলপটের ডেপুটি আর ৮৭ বত্সর বয়সী খিউ ছিলেন রাজ্যের প্রধান। চ্যাম মুসলিম ও কাম্বোডিয়ায় বসবাসকারী ভিয়েতনামের বাসিন্দাদের নিশ্চিহ্ন করিতে চার বত্সর ধরিয়া ভয়ঙ্কর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে খেমাররুজ বাহিনী। কিন্তু তাহাকে আন্তর্জাতিক আইনে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলা হইবে, নাকি গণহত্যা—তাহা লইয়া বিতর্ক ছিল দীর্ঘদিন। তবে, শুনানি চলাকালে পলপটের ১৯৭৮ সালের একটি ভাষণ বিশেষভাবে সাক্ষ্য দেয় গণহত্যার পক্ষে। সেই ভাষণে শোনা যায় যে—ভিয়েতনামের বাসিন্দাদের একজনও যাহাতে কাম্বোডিয়ায় না থাকে, তাহা নিশ্চিত করিবেন পলপট। একটি সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করিবার চেষ্টা গণহত্যা বৈ অন্য কিছু নহে। নুওন ও খিউ—দুইজনেই ইতোমধ্যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, খুন, অত্যাচার, অপহরণে দোষী সাব্যস্ত হইয়াছেন। ইহার জন্য তাহারা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজাও খাটিতেছেন। কিন্তু গণহত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্তের ঘটনা এই প্রথম।

প্রাচীনকাল হইতেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শত-সহস্র যুদ্ধ সংঘটিত হইয়া আসিতেছে। তবে প্রাচীনকালেও যুদ্ধের নিয়ম-নীতি ছিল, অলিখিত হইলেও সেই নিয়ম মানা হইত। কিন্তু সাম্রাজ্য বিস্তার, গোত্রীয় যুদ্ধ, উপনিবেশ স্থাপনের যুদ্ধ—প্রভৃতি ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা করা হইত না। ১৮৯৯ সালে ফিলিপাইন-আমেরিকান যুদ্ধের সময়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দ্যেশ্য নেদারল্যান্ডে হেগ পিস কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। সেইখানে প্রথমবারের মতো ‘ল অব ওয়ারক্রাইম’ চিহ্নিত করিয়া তাহা আন্তর্জাতিক আইন হিসাবে গ্রহণ করিবার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ইহার পর আমরা দেখিয়াছি, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নািস জার্মানি কর্তৃক লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষ, বিশেষ করিয়া ইহুদিদের হত্যা এবং জাপান কর্তৃক বেসামরিক জনসাধারণ হত্যা ও যুদ্ধবন্দিদের উপর ভয়ানক নির্যাতনের কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দিকে নজর দেওয়া হয়। ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট জেনেভায় বিশ্বের ৫৮টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘জেনেভা কনভেনশন’ চুক্তি। এইসব চুক্তির মধ্যে সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধকালীন বেসামরিক লোকের মৌলিক অধিকার ও প্রতিরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মানবসভ্যতার বিকাশ আর যুদ্ধ সমান্তরালে চলিয়াছে। শান্তি ও স্বস্তিময় একটি স্থিতিশীল বিশ্ব যতদিন না আসিবে ততদিন অবধি বিবিধ কারণে এই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধাবস্থা দেখা দিতেই পারে। যুদ্ধ থাকিলে সেইখানে যুদ্ধাপরাধও থাকিবে, মানবতাও অপহূত হইবে। তবে এইসকল যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাহরণকারীর স্মরণ রাখা উচিত—যদি কেহ অপরাধ করিয়া থাকেন, তবে কখনো না কখনো তাহার বিচার হইবে। মানবতা রক্ষার চেষ্টা হিসাবে এই রায় সামান্য নহে।