যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্কুলশিশুদের এক অভিনব প্রয়াস

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৬

বিলেতে কর্মজীবনের শুরুতে স্কুল-শিক্ষিকা পরিচয়টি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়েছিলাম। আর ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের প্রতি বরাবরই অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করত। স্রষ্টা হয়ত-বা মনের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। চোখ পড়ল বিলেতের খ্যাতনামা দৈনিক ‘ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ডের’ যৌথ ক্যাম্পেইন ‘ওয়ার চাইল্ড’ চ্যারিটির কর্মকাণ্ডে—‘লার্ন টু লাইভ’ নামে যারা ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে ব্রিটেনের সেরা স্কুলগুলোকে ও নেতৃস্থানীয় শিক্ষকদের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করেছেন সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন সহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত শিশুদের সঙ্গে। উদ্দেশ্য শিক্ষা নামক দুষ্প্রাপ্য অধিকারটিকে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত কুঁকড়ে যাওয়া মনগুলোকে সুশিক্ষার মাধ্যমে তাদের অন্ধকার শৈশবকে পেছনে ফেলে একটি স্নেহময় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে এই অসাধারণ প্রকল্পটি।

‘জাটারি’ রিফিউজি ক্যাম্প নামে সমধিক পরিচিত এই শরণার্থী ক্যাম্পটি উত্তর জর্ডানে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম শরণার্থী শিবির যেটি বর্তমানে ৮০ হাজার মানুষের এক সংগ্রামমুখর তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বোমা আর বুলেটের অবিরত বর্ষণের মধ্যে  শিশুরা প্রত্যক্ষ করেছে তাদের নিরপরাধ বাবা-মার মর্মান্তিক মৃত্যু। ১৬ বছরের কিশোরী রুলা, দুর্ভাগ্যতাড়িত এ পথসঙ্গীদের মাঝে হয়ত-বা কিছুটা হলেও ভাগ্যবান। সাত বছর আগে ‘ডারায়’ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া তার শৈশবের বাড়িটি আজ এক ভূতুড়ে কুঠুরি ছাড়া আর কিছুই নয়! ‘জাটারি’ ক্যাম্পের স্থায়ী বাসিন্দা রুলা তার সংকুচিত পৃথিবীতে ক্রমশ গজিয়ে উঠা শিশু শ্রম আর বাল্যবিবাহের অভিশাপ ছাড়া আর কিছু প্রত্যক্ষ করছে না। রুলার ১৯ আর ২১ বছর বয়সী দু’বোন দামাস্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, অথচ সংসার শুরু অথবা নতুন জীবনের সূচনা যেকোনো কিছুর জন্য তারা ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের কাছে একান্ত বাধ্য, এমনকি অস্থায়ী বসতি ত্যাগের ক্ষেত্রেও!

৫৪ বছর বয়সী রুলার বাবা ইয়াসিন দ্বিধান্বিত তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে। সাদা হিজাবে আপাদমস্তক মোড়ানো রুলার মুখের হাসিটি ছিল বরাবরই সজীব সাহসিকতায় ভরা। ‘হিউম্যান রাইটস লইয়ার’ হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্নকে সামনে রেখে আত্মপ্রত্যয়ী কিশোরীটির সপ্রতিভ উচ্চারণ; আমি মানুষকে সাহায্য করতে চাই এবং তাদেরকে সুখী দেখতে চাই। পড়াশোনা আর কাজের মাধ্যমে আমি আমার ছোট্ট পৃথিবীটিকে অনেক বড় করতে চাই। রুলার স্বপ্ন ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ নিয়েছে, ক্যাম্পে প্রতিবেশী শিশুদের নিয়ে সে গড়ে তুলেছে  ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট অব হোপ’ নামক একটি সহায়তা কার্যক্রম।

১৬ বছর বয়সী ডিভোর্সি আজেহ যে প্রতিনিয়ত সংসার ভাঙার দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে, আরিজ— যে মাত্র ১১ বছর বয়সে উর্দিধারী সেনাদের বুটের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য বাড়ি ছেড়েছে, আলি— যে কিনা তার চারপাশের হতাশা আর বঞ্চনাগুলোকে লেখার মাধ্যমে সহস্র পাঠক তৈরি করতে চায় কিংবা জাইন— স্বপ্ন যার মেসি হওয়ার প্রত্যেকে রুলার প্রতি তাদের সহমর্মিতার হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের এ মুষ্ঠিবদ্ধ হাতগুলোকে দৃঢ় হাতে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে চান জর্ডানিয়ান শিক্ষিকা হাতিম, যিনি সম্পূর্ণ নিজ খরচে সৃজনশীল শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন শিল্পীদের নিয়ে একটি রিলিফ স্কিম। তার ভাষায় শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো নয়, উন্নত দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে পারিবারিক অসুবিধা এবং আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে অনেক শিশুই তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ একটাই, তাদের পরিচয় তারা অনাবাসী। ইউএন রিফিউজি এজেন্সির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আজ শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫.৪ মিলিয়ন। শতকরা ৫৭ ভাগ শরণার্থীর আগমন দক্ষিণ সুদান, আফগানিস্তান আর সিরিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেখানে, প্রতি ৬ জনে ১ জন শিশু আজ যুদ্ধে মারা যাচ্ছে এবং প্রতি ৫ জনে ১ জন যুদ্ধশিশু স্কুলে অনুপস্থিত সেখানে এ ধরনের নিঃস্বার্থ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রচনা করবে ব্রিটেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্কুলগুলোতে। ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষক আন্দ্রিয়া জাফিরাকু, যার পরিচিতি আজ ব্রিটেনের সীমানা ডিঙ্তিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, সম্প্রতি জিতে নিয়েছেন ভারকে ফাউন্ডেশন আয়োজিত ১ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ‘গ্লোবাল টিচার প্রাইজ’ তিনি এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা। ব্রেন্টের আলপারটন কমিউনিটি স্কুলের জনপ্রিয় এ আন্তর্জাতিক বক্তার উচ্ছ্বাসপূর্ণ স্বীকারোক্তি; যখন আমি এ ক্যাম্পেইনের কথা শুনেছি, তখন একটি কথাই আমার মনে হয়েছে, অবশেষে! বছরের পর বছর আমি অপেক্ষা করে ছিলাম এ ধরনের একটি কার্যকর প্রকল্পের জন্য।

শিক্ষা শুধুই নিছক ক্যারিয়ার গড়া কিংবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার হাতিয়ার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মনের উদারতা বাড়াতে এটি ভীষণ সহায়ক। আন্দ্রিয়ার সহসঙ্গী হিসেবে এ প্রকল্পে আরও যে কটি উজ্জ্বল মুখ আলো ছড়াচ্ছেন তাঁরা হলেন অভিনেত্রী ক্যারি মুলেগান, গায়ক সিম স্মিথ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সচিব পেনি মোরডেন্ট। মুলিগান এবং স্মিথ যারা উভয়ে ‘ওয়ার চাইল্ড’ ইউকের গ্লোবাল এমব্যাসাডরস, তাঁদেরও নিখাদ সমর্থন রয়েছে এ গতিময় প্রকল্পে; বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ২৫০ মিলিয়ন শিশু পরিস্থিতিগত কারণে আজ সংঘর্ষে লিপ্ত, শতকরা ৭৫ ভাগ শিশু ৯০ দশকের শুরু থেকে সংঘাতময় এলাকাগুলোতে বসবাস করছে এবং বর্তমানে ‘জাটারি’ ক্যাম্পে ২৪-এর নিচে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এ হতাশাজনক পরিস্থিতি বিবেচনায় মুলিগান এবং স্মিথ প্রত্যেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে আশার বচন: ‘আমরা দু’জনে দারুণ উত্তেজিত! নিছক খ্যাতির পেছনে দৌড়ানো নয়, বরং দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে পেছনে ফেলে নতুন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা যা জন্মগত পরিচয়কে পেছনে ফেলতে বাধ্য। ক্যাবিনেট মিনিস্টার মোরডেন্টও ক্ষমতাসীন টোরি সরকারের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এ চলমান প্রক্রিয়াটিতে। তাঁর ভাষায়, আমরা গর্ববোধ করি ব্রিটেনের এ প্রকল্পে সংযুক্ত হওয়াকে। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই সিরিয়ার শরণার্থী থেকে শুরু করে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, আনুমানিক ৭৫ মিলিয়ন উঠতি তরুণের ভবিষ্যত্ বিপন্ন। একটি সম্ভাবনাময় বিশাল প্রজন্ম কি তবে হারিয়ে যেতে বসেছে?

ইতোমধ্যে ব্রিটেনের নেতৃস্থানীয় ৪টি স্কুল ইরাক, জর্ডান আর সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের স্কুলগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে এবং ইউকে এইড ও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট একযোগে কাজ করে চলেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে। সময় তাকিয়ে আছে অদূর ভবিষ্যতে, একটি সুদক্ষ মিশ্র প্রজন্মের বিকাশের অপেক্ষায়। (সূত্র: ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড)

n লেখক:এলবিপিসি, লন্ডন