মৌলভীবাজার জেলায় এ বছর রোপা আমন ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষকের মুখে এখন হাসি। তবে শ্রমিক সংকট থাকায় প্রতি বছর কৃষকরা সময়মতো মাঠ থেকে ধান ঘরে তুলতে পারেন না। শ্রমিক সংকট নিরসনে কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে কৃষকদের উত্সাহী ও যান্ত্রিকনির্ভর করতে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে।
প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে দেখা দেয় শ্রমিক সংকট। কখনো শ্রমিকের জোগান পেলেও অতিরিক্ত মজুরি টাকা দিয়ে আনতে হয় তাদের। এ ছাড়াও শ্রমিক সংকট থাকায় জমি থেকে ধান উঠাতেও বিলম্ব হচ্ছে। এতে অনেক ধান জমিতে ঝরে গিয়ে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জমিতে ধান প্রায় এক সঙ্গে পাকে। তখন শ্রমিক সংকটে ধান ঘরে তোলা যায় না। এ সংকট থেকে রেহাই পেতে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনটি স্থানীয় কৃষকদের দুর্ভোগ লাঘব করেছে। স্থানীয় কৃষক সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহিন বলেন, মেশিনটি আমাদের খুব উপকারে এসেছে। একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াই শেষে মেশিন থেকে একদিকে ন্যাড়া আর অন্যদিকে ধান বের হয়ে আসে। সময় বাঁচে, খরচও কম পড়ে। গত বছর মেশিন ছাড়া প্রতি কেয়ারে ৩৫-৩৮’শ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ বছর কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটায় ১২-১৫’শ টাকা খরচ হতে পারে। তবে ১২০ কেয়ার জমির ধান কাটা শেষে চূড়ান্ত খরচ বলা যাবে।
কৃষক মখলিস মিয়া বলেন, জমিতে ধানতো প্রায় এক সময়ে পাকে। তখন শ্রমিক সংকটে ধান ঘরে তোলা যায় না। অনেক ধান নষ্ট হয়। এছাড়া যাও কিছু শ্রমিক পাওয়া যায় মজুরি অনেক বেশি চায়। এই সংকট থেকে রেহাই পেতে মেশিনটি অনেক ভালো।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ শাহজাহান জানান, কম্বাইন হারভেস্টার দ্বারা ধান কর্তন করলে লেবার খরচ অনেক কম হয়। এই মেশিন দ্বারা প্রতি ঘণ্টায় ৩ বিঘা জমির ধান কর্তন করা যায়। যার জ্বালানি খরচ লাগে ১৪ লিটার ডিজেল। মূল্য ৮০০-৯০০ টাকা। তা ছাড়া দুর্যোগকালীন অল্প সময়ে কম খরচে ধান কর্তন করে ঘরে তোলা সম্ভব। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতায় খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উত্পাদন বৃদ্ধি প্রকল্প ২য় পর্যায়ের আওতায় কম সময়ে অল্প খরচে কম্বাইন হারভেস্টার দ্বারা আমন ধান কর্তন, মাড়াই, ঝাড়াই শুরু হয়েছে। কম খরচ ও কম সময়ে অধিক জমির ধান সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকার কৃষকদের সুবিধার জন্য আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো ভর্তুকি দিয়ে প্রদান করছে। বিভিন্ন দামের ছোট-বড় মেশিন রয়েছে। কৃষকরা নিজেদের চাহিদা মতো ব্যবহার করতে পারবে। এই সব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কৃষকরা উপকৃত হবে।
কৃষি বিভাগের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কাজী লুত্ফুর বারী বলেন, কম্বাইন হারভেস্টার দ্বারা ধান কর্তন এই সময়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কারণ যখন শ্রমিকের অভাবে পাকা ধান মাঠে পড়ে রয়েছে ঠিক তখনই কম্বাইন হারভেস্টার দ্বারা ধান কর্তন শুরু হয়েছে। দেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে সেই সঙ্গে বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে। যেন আধুনিক যন্ত্রপাতি কৃষিকাজে ব্যবহার করে কৃষির উত্পাদন বৃদ্ধি করা যায়। তারই ফলশ্রুতিতে আজকের কম্বাইন হারভেস্টার দ্বারা আমন ধান কর্তন এখন যুগোপযোগী। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উত্সাহিত করতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু এলাকায় কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দিয়ে আমন ধান কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের সূচনা করা হয়। সারাদেশে কৃষি বিভাগের অধীনে এ ধরনের ৭টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন রয়েছে।
ধান কাটার প্রথম দিনে উপস্থিত ছিলেন জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অফিসের উপ-পরিচালক মোঃ শাহজাহান, জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার কাজী লুত্ফুর বারী, সদর উপজেলা কৃষি অফিসার সুব্রত কান্তি দত্ত, শ্রীমঙ্গল উপজেলা অফিসার নিলুফার ইয়াসমিন মুনালিছা সুইটি, জিয়াউল হুদাসহ অন্যান্য কৃষি কর্মকতা। এছাড়া আশপাশ এলাকার কৌতূহলী কৃষকরা নতুন এ মেশিনে ধান কাটা দেখতে সমবেত হন। কৃষি বিভাগ জানায়, এ বছর জেলায় আমন ধানের চাষাবাদের জমির পরিমাণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৬ হাজার দুইশ হেক্টর জমি। আবাদ হয়েছে ৯৮ হাজার ৪শ হেক্টর। জাতীয় উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উত্পাদন হবে বলে আশাবাদী।
