আত্মসমর্পণের পর ১০২ ইয়াবা কারবারি জেলে

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩০

কক্সবাজারের টেকনাফে আনুষ্ঠানিকভাবে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা ইয়াবা আর অস্ত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। এ সময় সাড়ে ৩ লাখ পিস ইয়াবা, তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭০টি কার্তুজ জমা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান শেষে আত্মসমর্পণকারীদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। আর উদ্ধার করা ইয়াবা বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদরে জমা রাখা হয়েছে। 

গতকাল শনিবার সকালে টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অন্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। না হলে কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন। আত্মসমর্পণ করা ১০২ জনের মধ্যে কক্সবাজারের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চার ভাই ও ১২ আত্মীয়সহ ১৬ জন আছেন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদি মনোনয়ন না পেলেও তার স্ত্রী শাহীন আক্তার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান। নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের কথা হরহামেশাই শোনা যায়। এমনকি সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের ঘটনাও আগে ঘটেছে। চরমপন্থিরাও আত্মসমর্পণ করেছে। তবে এবারই প্রথম ইয়াবা কারবারিরা আত্মসমর্পণ করলেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, কক্সবাজারে সরকারের তালিকাভুক্ত বড় ইয়াবা কারবারি আছেন ৭৩ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। এই ২৪ জনের মধ্যে আছেন সাবেক এমপি বদির চার ভাই আবদুল শুক্কুর, আবদুল আমিন, মো. শফিক ও মো. ফয়সাল, বদির ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপুসহ ১৬ জন। এ ছাড়া আছেন- টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার মিয়া, হ্নীলার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য নুরুল হুদা ও জামাল হোসেন,  টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, নারী কাউন্সিলর কহিনুর বেগমের স্বামী শাহ আলম, টেকনাফ সদর ইউপি সদস্য এনামুল হক, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দুই ভাই জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমান প্রমুখ।

তালিকার এক নম্বরে থাকা বদি আত্মসমর্পণ করেননি :যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ২ থেকে ১৬টি মামলা আছে। ৭৩ বড় কারবারির যে তালিকা আছে তারমধ্যে ২৪ জন আত্মসমর্পণের পর বাকি আছেন আরো ৪৯ জন। এর মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ছয়জন। বাকি ৪৩ জনের কেউই আত্মসমর্পণ করেননি। এর মধ্যে তালিকার এক নম্বরে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য বদি নিজেও আত্মসমর্পণ করেননি। তালিকার দুই নম্বরে থাকা সাইফুল করিম বিদেশে অবস্থান করছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সব ক’টি তালিকায় ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে আবদুর রহমান বদি ও তার ৫ ভাই, এক বোনসহ ২৬ জন নিকটাত্মীয়ের নাম আছে।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ছাড়াও এ সময় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-৪  আসনের সংসদ সদস্য শাহীন আক্তার, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডারসহ পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উখিয়া-টেকনাফসহ ১৯৩টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা দেশে ঢুকছে। মিয়ানমারকে ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ করতে অনেকবার বলেছি। তারা বলে কিন্তু বাস্তবে কিছুই করে না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সীমান্তকে আমরা কঠোরভাবে সুরক্ষা করব। একইসঙ্গে টেকনাফসহ কক্সবাজারকে ইয়াবামুক্ত করতে সবার সহযোগিতা চান তিনি। মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইয়াবা এখন পুরো দেশকে গ্রাস করেছে। তাই আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সেই সাথে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। আর যারা আজ আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ব্যাপারে তথ্য নেয়া হচ্ছে। তাদের সবাইকে অবশ্যই ধরা দিতে হবে। না হলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে তাদের।

মাদকের বিরুদ্ধে গত বছরের ৪ মে থেকে চালানো অভিযানের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে’ প্রায় তিনশ ইয়াবা কারবারি নিহত হন। এর মধ্যে ইয়াবার জেলা বলে খ্যাত কক্সবাজারেই ৪৪ জন নিহত হন।

আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, দেশের অন্যান্য স্থানেও এরকম আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেয়া হবে। পুলিশের কোনো সদস্য ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকলে তাকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে টেকনাফ মডেল থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে পৃথক দু’টি মামলা হবে। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হবে। তাদের সাধারণ ক্ষমার কোনো সুযোগ নেই। যা হবে প্রচলিত আইনেই হবে। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহযোগিতা করবে সরকার। 

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মাদক কারবারিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে ইয়াবা তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় ইয়াবা ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অঙ্গীকার করেন সিরাজ ও এনাম নামের দুই মাদক কারবারি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কক্সবাজারের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও জেলার ক্রীড়াঙ্গন নিয়ন্ত্রণকারী শাহজাহান আনসারীও এ দিন আত্মসমর্পণ করেন। সরকারের পাঁচটি সংস্থার সমন্বয়ে তৈরি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় কক্সবাজারের ইয়াবা ডন হিসাবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে আনসারী অন্যতম। পরিবহন কর্মচারী থেকে ইয়াবা ব্যবসা করে শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া আনসারীর কব্জায় রয়েছে পুরো জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।