যেসব কৃষক অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ক্ষতিকর এই নীলচাষে অস্বীকৃতি জানাতো তাদের ওপর নেমে আসতো নির্যাতনের স্টিম রোলার।
নীলকরদের অমানবিক অত্যাচারে অত্যাচারিত চাষিদের আর্তনাদ ভেসে আসতো বিভিন্ন নীলকুঠি থেকে। অত্যাচারে এ অঞ্চলের বঞ্চিত ও প্রতিবাদী কৃষকরা ১৯৪৭-৪৮ সালে অলাভজনক নীলচাষ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়
মো. আমিরুজ্জামান
সৈয়দপুর (নীলফামারী)
ব্রিটিশ বেনিয়াদের নীল চাষের উম্মাত্ততায় সর্ব উত্তরের এ অঞ্চলের নিরীহ কৃষকদের ওপর জুলুম-অত্যাচার, নির্মম নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলফামারীর অসংখ্য নীলকুঠি। ‘নীলফামারী’ নামকরণের সাথেও জড়িত আছে ব্রিটিশ নীলকররা। এ দেশের চাষিদের ওপর অন্যায় চাপ প্রয়োগের বিয়োগান্তক কাহিনির কথা ব্রিটিশদের নির্যাতনের সাক্ষী নীল খামার থেকেই এ জেলার (তত্কালীন মহকুমা) নাম নীলখামারি থেকে নীলফামারী হয় বলে জনশ্রুত আছে।
এ অঞ্চলের উর্বর মৃত্তিকায় প্রচুর নীল উত্পন্ন হতো। সে কারণেই ব্রিটিশরা বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় এই এলাকার বিপুলসংখ্যক নীলকুঠি বা নীলখামার গড়ে তোলে। অষ্টাদশ শতাব্দির প্রথমদিকে নীলফামারীর কাজীরহাটসহ এ অঞ্চলের বড় বড় জমিদারিগুলো ভেঙে নতুন নতুন জমিদারি সৃষ্টি হয়। এ সময় ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা সুযোগ মতো নিজেদের নীল চাষের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে থাকে। শুরুর দিকে নীলকররা এ অঞ্চলের চাষিদের আগাম অর্থ ধার দিয়ে তাদের নীল চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে। এতে কিছু চাষি নীল চাষ শুরু করলে জমিদারির রাজস্ব আয় কমে আসে। জমিদাররা বাধ্য হয়ে ১৮০১ সালের ১০ এপ্রিল ১৩ জন জমিদারের যৌথ স্বাক্ষরিত এক অভিযোগনামা ইংরেজ কোম্পানির কাছে জমা দেয়। তারপরও থেমে থাকেনি কুঠি শাসন।
ইংরেজ কর্মচারিরা একের পর এক নীলকুঠি ও খামার গড়তে শুরু করে। সদর থানায় চিনির কুঠি ও দুরা কুঠিতে বড় বড় দুটি নীলকুঠি গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই নীলকুঠির সংখ্যা আরো বাড়তে থাকে। নীলফামারী শহরের প্রাণকেন্দ্র এ একটি নীলকুঠি, শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন স্টেশনসংলগ্ন নটখানা এলাকায় আরেকটি বড় নীলকুঠি, দারোয়ানী নীলকুঠি, সংগলশী ইউনিয়নের নীলকুঠি—এমন অসংখ্য নীলকুঠি ও নীলখামার গড়ে ওঠে। নীলফামারীতেই নীল চাষের উপযোগী উর্বর মৃত্তিকা থাকায় এখানকার চাষিদের ওপর চোখ পড়ে ইংরেজ বেনিয়াদের। বিভিন্ন কুঠিবাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো কৃষকদের। এসব কুঠিবাড়ি প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণেই নীলফামারীতে সবচেয়ে বেশি উত্পাদন হতো নীল। কিন্তু যেসব কৃষক অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ক্ষতিকর এই নীলচাষে অস্বীকৃতি জানাতো তাদের ওপর নেমে আসতো নির্যাতনের স্টিম রোলার।
নীলকরদের অমানবিক অত্যাচারে অত্যাচারিত চাষিদের আর্তনাদ ভেসে আসতো বিভিন্ন নীলকুঠি থেকে। অত্যাচারে এ অঞ্চলের বঞ্চিত ও প্রতিবাদী কৃষকরা ১৯৪৭-৪৮ সালে অলাভজনক নীলচাষ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এরপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়লে ১৯৮৫ সালে এ অঞ্চলের কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয় ব্যাপক বিদ্রোহ। নীলচাষ একেবারে মুখথুবড়ে পড়ে বিদ্রোহের কারণে।
নীলখামার থেকে উদ্বুদ্ধ নীলফামারীতে ইতিহাস খ্যাত নীল বিদ্রোহের কাহিনি থেকে জানা যায়, নানা বিয়োগান্তক কথা। বহুল আলোচিত নীলদর্পন নাটকে রূপায়িত হয় এর বহু খণ্ডচিত্র। নীলফামারীর সহজ-সরল, নিপীড়িত কৃষককে তারপরও দারুণভাবে শোষণ করেছে ইংরেজরা। ইংরেজদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল অনেকেই। এ জনপদে শোষণ আর নির্যাতনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠিগুলো। কিন্তু বেশিরভাগই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের অভাবে তেমনই নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে নীলফামারীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বহু স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ও নান্দনিক ‘নীলকুঠি ও বাংলো’টিও।
নীলফামারীর ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিবিজড়িত নীলকুঠি ও ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এটি জাদুঘরে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন নীলফামারীবাসী। নীলফামারীবাসী নাড়ির বোধ করে এই অনুপম স্থাপত্যশৈলী কুঠিবাড়িটির প্রতি। স্থানীয়দের দাবি নীলকুঠি স্মৃতি আগামী প্রজম্মের জন্য সংরক্ষণ করে একে জাদুঘর করা। যা থেকে উপকৃত হবে নীলফামারীর পরবর্তী প্রজম্ম। নীলফামারীর মানুষ এই কুঠি হারাতে চায় না, বরং একে আকর্ষণীয় করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে চায়। ১৮৭৪ সালে নীলকররা এই নীলকুঠি বাড়ি স্থাপন করে। এখান থেকে কৃষকদের জোরপূর্বক নীল চাষসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি প্রদান করা হতো বলে জনশ্রুত আছে। বর্তমানে এটি সরকারি কর্মকর্তারা অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহার করছেন।
