বর্ণ ও শব্দে প্যালিনড্রোমের খেলা!

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৫৮

মেহেদী হাসান গালিব

 

মাধ্যমিকে থাকাকালীন একবার বাংলার স্যার ব্লাকবোর্ডে ‘রমাকান্ত কামার’ লিখে বললেন, ‘দেখ তো কেউ বুঝিস কি-না?’ আমরা সবাই মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে লাগলাম, এই ব্যাটা আবার কে? বইয়ের কোনো গল্পের চরিত্রের নাম বলে তো মনে পড়ছে না। খানিকক্ষণ পর স্যার মুচকি হেসে বললেন, ‘লেখাটা একবার ডান থেকে পড়, তারপর আবার বাম থেকে।’ স্যারের কথামতো আমরা সবাই দু-দিক থেকে লেখাটা পড়লাম। একি কাণ্ড! ডানদিক থেকে পড়লেও যা হচ্ছে, বামদিক থেকে পড়লেও তা। স্যার আমাদের সবাইকে এ রকম শব্দ দুটো করে পরের দিন লিখে আনতে বললেন। আমরা নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে, গণিত স্যারের হোমওয়ার্ক ভুলে গিয়ে লেগে পড়লাম শব্দ খোঁজার খেলায়। পত্র-পত্রিকা, অভিধান তন্নতন্ন করে খুঁজে কেউ কেউ বের করলো রমাকান্ত কামারের মতো দ্বিমুখী গুটিকয়েক শব্দ। তবে অধিকাংশই হাল ছেড়ে পরের দিন স্যারের ক্লাসে গেল খালি হাতে।

তবে বর্ণমালার এই ধাঁধায় হাল না ছেড়ে বরং সেটাকেই নিজের ভালোলাগায় পরিণত করা এক যুবকের নাম ফরিদ উদ্দীন। পেশায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আহসানউল্লাহ হলের একজন নিরাপত্তা প্রহরী। এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ফরিদ উদ্দিনের কবিতার বই ‘কথাথাক’, যে বইয়ের পরতে পরতে তিনি খেলেছেন বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে, শব্দের সঙ্গে। কখনো বা শব্দের ধাঁধায় জড়িয়েছেন কবিতাকে, কখনো বা সেই ধাঁধায় জড়িয়েছেন পাঠকদেরকে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-কী এমন ধাঁধা লুকিয়ে আছে কথাথাকের ভাঁজে। উত্তরটা দেওয়া আছে বইয়ের শিরোনামেই। ডানদিক থেকে পড়লে যে শব্দ হচ্ছে, বামদিক থেকে পড়লেও পাওয়া যাচ্ছে একই শব্দ। এ ধরনের শব্দগুলোকে বলা হয়ে থাকে প্যালিনড্রোম, আর যারা এ ধরনের বর্ণ, শব্দ কিংবা বাক্য সাজাতে দক্ষ তাদের বলা হয় প্যালিনড্রোমিস্ট।

ফরিদের সাহিত্য চর্চায় প্যালিনড্রোমের এই বিচরণ সম্পর্কে জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০০৭ সালে। ফরিদ তখন আহসানউল্লাহ হলের নৈশপ্রহরী। প্রতিরাতে তার সঙ্গী হিসেবে কখনো থাকতো পত্রিকা, কখনো বা বই। ফরিদের বই পড়ার এই আগ্রহ নজরকাড়ে আহসানউল্লাহ হলের দুই শিক্ষার্থীর। একজন মেহেদী হাসান, অন্যজন শুভ্র চক্রবর্তী। বই পড়ার প্রতি ফরিদের আগ্রহ দেখে তারা তাকে নিয়মিত বই কিনে দিতে শুরু করেন। একদিন কথার প্রসঙ্গে ফরিদ তাদের জানালেন তার লেখালেখির কথা। তিনি প্রায় আড়াইশোর অধিক গান ও বেশকিছু চিত্রনাট্য লিখেছেন। তারা ফরিদকে লেখালেখির ক্ষেত্রে আরো উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে শুরু করেন। পাশাপাশি আরো বেশি করে বই পড়ার পরামর্শ দেন। তাদের পরামর্শ মতো ফরিদ শুরু করেন বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা। বন্ধুর এই আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখে তাকে কবিতা লেখার ব্যাপারে উত্সাহ জোগান নূরুল ইসলাম। বন্ধুর অনুপ্রেরণায় কবিতা লেখায় হাত দেন ফরিদ। তবে তিনি চেয়েছিলেন তার কবিতা হবে প্রচলিত ধারার চেয়ে একটি ভিন্নধর্মী ও বিচিত্র। তাই তো প্রথম কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি পার করে দিলেন প্রায় সাড়ে তিন বছর। কবিতার নাম ‘মুক্তিযোদ্ধা জঁ ক্যা’। এই কবিতার বিশেষত্ব হলো এখানে তিনি বাংলা বর্ণমালার ৫০টি বর্ণ একবার ব্যবহার করেছেন।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের অনুপ্রেরণায় ২০১৭ সালে ফরিদ উদ্দিন প্রকাশ করেন তার প্রথম কবিতার বই ‘বর্ণের খেলাঘর’। এই বইয়ের জন্য কবিতা লিখতে গিয়ে নিজের অজান্তেই ফরিদ লিখে ফেলেছিলেন একটি প্যালিনড্রোম কবিতা। আহসানউল্লাহ হলের এক শিক্ষার্থী কবিতাটি পড়ে ফরিদকে জানান প্যালিনড্রোমের কথা। বিষয়টা নজরকাড়ে ফরিদের। প্যালিনড্রোমের মধ্যে এক ধরনের মুগ্ধতা খুঁজে পান তিনি। তাই তো তখন থেকেই শুরু করে দেন বর্ণমালা নিয়ে খেলা। আর এই খেলাকে রূপ দিতে থাকেন কবিতায়। সেরকমই ২২টি কবিতাকে একটি মলাটের ভাঁজে আবদ্ধ করে লেখক লিখে ফেললেন তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘কথাথাক’।

প্যালিনড্রোমের মুগ্ধতায় ডুবে থাকা এই মানুষটার ছোটবেলা কেটেছে মামার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক পাস করেন ফরিদ। কিন্তু পরবর্তীতে আর উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুনো হয়নি তার। তবে তিনি তার পড়াশোনার গণ্ডিকে সীমাবদ্ধ করেননি স্কুল-কলেজের সীমিত পাঠ্যসূচির মাঝে। নিজের প্রচেষ্টায় চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা। ভবিষ্যতেও বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা, সাহিত্যচর্চা ও ভিন্নধাঁচের কবিতা লেখার মাঝেই থাকতে চান ফরিদ উদ্দিন।